ওসি প্রদীপের নৃশংসতার আরেক 'বলি' জলিল

  


পিএনএস ডেস্ক: সিএনজি অটোচালক আবদুল জলিল (৩৫)। এলাকায় গুরা পুতুইক্যা নামে পরিচিত। তাকে গ্রেফতার করে দীর্ঘ আট মাস থানায় আটক করে রাখে ওসি প্রদীপ। দিনের পর দিন অমানুষিক নির্যাতন এবং খাবার-পানি না পেয়ে কঙ্কালসার ব্যক্তিতে পরিণত হন আবদুল জলিল। এমন কঙ্কালসার ব্যক্তি যদি শত্রুও হয় তবু তাকে দেখলে যে কারো হৃদয়ে দয়ার উদ্রেক তো হবেই, বরং তাকে বাঁচানোর জন্য কিছুটা হলেও প্রয়াস চালাবেন যে কেউ। কিন্তু ওসি প্রদীপ তো মানুষ নয়। দয়া, মানবিকতা তার অভিধানে নেই। তাই এই কঙ্কালসার ব্যক্তিকে পরে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা সাজিয়ে হত্যা করতে কোনো রকম দ্বিধাবোধ করেনি ভয়ঙ্কর ওসি প্রদীপ। ওসি প্রদীপের বহিষ্কারের খবর পেয়ে এমনই একটি লোমহর্ষক ঘটনা জানাতে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের কাছে আসেন আবদুল জলিলের স্ত্রী ছেনুয়ারা। টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম মহেশখালীয়াপাড়ার মৃত হাজী আলী আহমদের ছেলে পুতুইক্যা সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন।

তার স্ত্রী ছেনুয়ারা জানান, ভয়ঙ্কর ওসি প্রদীপ ২০১৯ সালের ৩ ডিসেম্বর তাকে কক্সবাজার আদালত এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যায় টেকনাফ থানায়। ইয়াবা কারবারের তকমা লাগিয়ে ক্রসফায়ারের হুমকি দিয়ে দাবি করে বিশাল অঙ্কের টাকা। টাকা দিতে ব্যর্থ হওয়ায় তার জীবনে নেমে আসে ঘোর অন্ধকার। দিনের পর দিন আটকে রেখে অমানুষিক নির্যাতন করা হয় তাকে। এ সময় খাবার ও পানি কিছুই দেয়া হতো না তাকে। কোনো আত্মীয়স্বজনকে কোনো ধরনের খাবার এমনকি পানির বোতল নিয়ে যেত দিত না। তাকে আটকে রেখে নির্যাতন করতে থাকে। একসময় তিনি কঙ্কালসার ব্যক্তিতে পরিণত হন। পরে চলতি ২০২০ সালের ৭ জুলাই মেরিন ড্রাইভের ঝাউবাগানে নিয়ে ক্রসফায়ারে হত্যা করে আবদুল জলিলকে। স্বামীকে হারিয়ে এখনো কান্না থামছে না স্ত্রী ছেনুয়ারা বেগমের (২৫)। বাবা ফিরে আসবে এমন প্রতীক্ষায় দিন যায় রাত আসে আবদুল জলিলের দুই অবুঝ শিশুর।

ছেনুয়ারা বেগম এই প্রতিবেদককে জানান, তার স্বামীকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর শেখ শাহ আলম নামের ওসির প্রদীপের দালাল এক ব্যক্তি তার কাছে এক লাখ টাকা চান। টাকা দিলে তার স্বামীকে পাওয়া যাবে বলে প্রতিশ্রুতি দেন। আমি বিষয়টি ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আবদুল জব্বারকে জানাই। পরে আমি ওসি প্রদীপের পায়ে পড়ে চোখের পানি ফেলে আমার স্বামীকে ছেড়ে দেয়ার জন্য বলি কিন্তু ওসি আমার স্বামীকে ছেড়ে দেয়নি। পরে আমি এ বছরের ৭ জুলাই জানতে পারি আমার স্বামীকে ক্রসফায়ার দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। আমি কক্সবাজার লাশখানায় গিয়ে আমার স্বামীর লাশ গ্রহণ করি। ওসি প্রদীপকে হিটলারের সাথে তুলনা করছেন সীমান্তের নির্যাতিত মানুষরা।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, হিটলারের চেয়েও ওসি প্রদীপ ছিল আরো জঘন্য। আমি সব সময় ওসির এসব অন্যায় কাজকে সমর্থন দিইনি এবং প্রতিবাদ করেছি। ছেনুয়ারার কাছে তার স্বামীর ঘটনার বর্ণনা শুনে আমার চোখে পানি এসেছে। এসব ঘটনা এখন মানুষকে জানাতে আসছে প্রতিদিন। এ দিকে মেজর সিনহা হত্যাকাণ্ডের পর দুই বাহিনীর মধ্যে এমন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে না পড়তে ওসি প্রদীপের লাগাম অনেক আগেই টেনে ধরা উচিত ছিল বলে মনে করছেন কক্সবাজারের জেলা পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রশাসনের এসব দায়িত্বশীল সদস্য জানান, ওসি প্রদীপকে প্রতিটি বন্দুকযুদ্ধের পর ঘটনা সম্পর্কে সামান্যতমও জিজ্ঞাসাবাদ বা খোঁজখবর নেননি জেলা পুলিশ সুপার; যে কারণে ওসি প্রদীপ এতই বেপরোয়া হয়ে উঠেছিল যে যখন যেটা খেয়ালখুশিমতো তাই করত। যখন যাকে ইচ্ছা ধরে নিয়ে আসত এবং ইয়াবার তকমা লাগিয়ে মেরিন ড্রাইভে নিয়ে বন্দুকযুদ্ধ সম্পন্ন করত। এ দিকে প্রদীপের সাথে ফোনালাপ ফাঁস হওয়ার পর বিভিন্ন মহল থেকে কক্সবাজার পুলিশ সুপার এ বি এম মাসুদ আলমকে অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন।

কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নাজনীন সরওয়ার কাবেরী তার ফেসবুক ওয়ালে লিখেছেন, ‘কক্সবাজার পুলিশ সুপার মাসুদ সাহেবকে অবিলম্বে গ্রেফতার করে রিমান্ডে নেয়া হোক, তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড চাই। পূর্ব অপরাধেরও বিচার হোক।’ টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর জানান, ক্রসফায়ারের নামে মানুষ হত্যা করা ছিল ওসি প্রদীপের এক প্রকার নেশা। টেকনাফের নির্যাতিত বহু মানুষের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করার পরও ওসি প্রদীপ অনেককে ক্রসফায়ারে হত্যা করেছে।

টেকনাফ থেকে অন্তত ২০০ কোটি টাকা এই ওসি প্রদীপ নিয়ে গেছে বলে তিনি মন্তব্য করে বলেন, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার সত্যতা প্রমাণিত হবে। সূত্র: নয়া দিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন