সরাইল অরুয়াইল বহুমৃখী উচ্চ বিদ্যালয়ে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের স্বেচ্ছাচারিতা-অনিয়ম

  

পিএনএস, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মোঃ রাকিবুর রহমান রকিব : ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা সরাইল উপজেলার অরুয়াইল বহুমৃখী উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রধান শিক্ষক এবং ম্যানেজিং কমিটি সভাপতির স্বেচ্ছাচারিতায়, অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও বিধি বহির্ভূতভাবে পরিচালিত হচ্ছে। এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির নানা কার্যক্রমে সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক দু’জনেই অনৈতিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ মিলেছে।

কয়েক হাজার শিক্ষার্থীদের এ প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক শেখসাদী ও ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. কুতুবউদ্দিন ভূঁইয়া তাদের খেয়াল খুশিমতে একেরপর এক আইন ভঙ্গ করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে যাচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নীতিমালা অমান্য করে শিক্ষার্থীদের বেতনবৃদ্ধি, বিধি বহির্ভূত বিভিন্ন ফি আদায়, উপবৃত্তির টাকা আত্মসাৎ, ইচ্ছাকৃত ভাবে পাবলিক পরীক্ষা থেকে শত শিক্ষার্থীকে বঞ্চিত করা, আইন অমান্য করে বিদ্যালয়ের নামে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা, বিদ্যালয়ের জায়গায় মার্কেট কাম একাডেমিক ভবন নির্মাণে দুই কোটি টাকার কাজে অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এছাড়া বিদ্যালয়ের মার্কেটে ২৫-৩০ বছর ধরে ব্যবসা করে আসা পাঁচ ব্যবসায়ীর নামে থাকা দোকান অবৈধ ভাবে বরাদ্দ বাতিল করে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও অভিভাবক সদস্যরা তাদের নিকট আত্মীয় ও পছন্দের লোকদের নামে দোকান বরাদ্দ দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেছে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের করা দুইটি তদন্ত প্রতিবেদনে।

নিয়ম নীতি অমান্য করে বিদ্যালয়ের গাছ কেটে বিক্রি, নিলাম ছাড়া লাখ লাখ টাকার মালামাল বিক্রি, কোনো টেন্ডার ছাড়াই কোটি টাকার নির্মাণ কাজ করা হয়েছে বলে তথ্য প্রমাণ উঠেছে এসেছে কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গঠিত আলাদা দুটি কমিটির তদন্ত প্রতিবেদনে।

‘ব্যাপক অনিয়ম’ ও বিধি বহির্ভূত কাজের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎসহ অন্যান্য অভিযোগের প্রমাণ পাওয়ায় বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটি ভেঙ্গে দেওয়া এবং প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে এসব প্রতিবেদনে। কুমিল্লা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসনের নির্দেশে দুটি তদন্ত করেন সরাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সহিদ খালিদ জামিল খান।

গত ১৭ অক্টোবর শিক্ষা বোর্ডে সাত পাতার তদন্ত প্রতিবেদন এবং এর আগে ৯ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে নয় পাতার তদন্ত প্রতিবেদন সহ অন্যান্য কাগজ পত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে তিনি জমা দেন।

শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত : প্রধান শিক্ষকের দেওয়া তথ্য উল্লেখ করে শিক্ষা বোর্ডের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে ১৯৯৬ সাল থেকে ম্যানেজিং কমিটির এক সভার সিদ্ধান্তে শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের জন্য শিক্ষার্থীদের নিকট থেকে বার্ষিক ১৫ টাকা হারে অতিরিক্ত ফি আদায় করে আসছে। যাহা সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। গত বছরের ৩ ডিসেম্বরের বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটির সভার রেজুলেশন পর্যালোচনা করার কথা জানিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই সভায় শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন ও টিউশন ফি বৃদ্ধি করা হয়, সেখানে ষষ্ঠ শ্রেণী শিক্ষার্থীদের জন্য ৮০ টাকা, সপ্তম ৯০ টাকা, অষ্টম ১০০ টাকা এবং নবম ও দশম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য ১২০ টাকা করা হয় একই সাথে সব শ্রেণীর শিক্ষার্থী থেকে বিদ্যুৎ ১০ টাকা, আইসিটি ১৫ টাকা, মসজিদ লাইব্রেরীর জন্য ১০ টাকা সহ মোট ৩৫ টাকা করে নেওয়া হয়। এ সভায় উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত টিউশন ফি নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয় বলে প্রতিবেদনে উঠে আসে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেতন ও টিউশন ফি বৃদ্ধির সু-স্পষ্ট নীতি মালা থাকা সত্বেও অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় সরকারি পরিপত্র অনুসরণ না করে নিজেদের ‘খেয়াল খুশিমত’ শিক্ষার্থীদের বেতন ও টিউশন ফি সহ অন্যান্য ফি বৃদ্ধি করেছে; যা সরাসরি সরকারি বিধির পরিপন্থী। প্রতিবেদেন আরো বলা হয়, এই বিদ্যালয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশ অমান্য করে উপবৃত্তি পাওয়া শিক্ষার্থীদের থেকে টিউশন ফি গ্রহণ করে সরকারি আদেশ অমান্য করেছে; যার ফলে মাঠ পর্যায়ে সরকারের ভাবমুর্তি বিনষ্ট হচ্ছে। তদন্তে দেখা যায়, এ বিদ্যালয়ে ২০১৮ সালের অষ্টম শ্রেণীর ৪১১ শিক্ষার্থীর মধ্যে শিক্ষা বোর্ডের নির্ধারিত সময়ে ২৮৩ জনের জেএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করা হয়। প্রধান শিক্ষকের অবহেলায় বাকি ১২৮ শিক্ষার্থী তখন পরীক্ষা দেওয়া থেকে সুযোগ হারায়। তবে শিক্ষা বোর্ড বিশেষ বিবেচনায় ৮২ জন শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ করে।

জেলা প্রশাসনের তদন্ত : অন্য দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো রেজুলেশনে বিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন কাম মার্কেট নির্মাণের বাজেট সংক্রান্ত আলোচনা হয়নি। এ কাজের জন্য কোনো ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্মকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। “শুধুমাত্র নামে মাত্র একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করা হয়। প্রধান শিক্ষক তদন্তের পরে একটি ইঞ্জিনিয়ারিং ফার্ম থেকে তৈরি করা স্বাক্ষর বিহীন একটি নকশা দাখিল করেছিলেন।”এ প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যালয়ের নামে স্থায়ী ভাবে বন্দোবস্ত পাওয়া ২০ শতক জায়গায় ব্যবসায়ীদের থেকে অগ্রিম নেওয়া টাকা দিয়ে মার্কেট করা হয়েছে। অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের মার্কেট সংলগ্ন একাডেমিক ভবন নির্মাণ, প্রতিষ্ঠানের গাছ কর্তন এবং পুরাতন মালামাল বিক্রি সম্পূর্ণ বিধি বহির্ভূত হয়েছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, এর জন্য ম্যানেজিং কমিটিসহ প্রধান শিক্ষক দায়ী। এতে বলা হয়, দোকান পাওয়া থেকে বঞ্চিত ব্যবসায়ীদের দোকান বরাদ্দ বাতিল করা হয়েছে গত ২৮ এপ্রিল, কিন্তু এ দোকান গুলোর অনুকূলে এক বছর আগেই নতুন করে বরাদ্দ পাওয়া পাঁচজন গ্রাহক থেকে বেআইনি ভাবে জামানত নেওয়া হয়; যা সম্পূর্ণ পূর্ব পরিকল্পিত বলে প্রতীয়মান হয়। প্রকল্প বাস্তায়ন কমিটির ডিজাইন ও প্রাক্কলন ছাড়া একাডেমিক ভবন কাম মার্কেট কতটুকু নিরাপদ হয়েছে এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের মতামত গ্রহনের প্রয়োজন থাকলেও তা করা হয়নি। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিধি মোতাবেক একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একটি মাত্র ব্যাংক হিসাব থাকবে, যা বিদ্যালয়ের কলামনার ক্যাশ বইয়ে সম্পৃক্ত হবে। কিন্তু এ বিদ্যালয়ের নামে স্থানীয় জনতা ব্যাংকের শাখায় দুটি ব্যাংক হিসাবের মধ্যে উন্নয়ন সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের লেনদেন কলামনার ক্যাশ বহিতে লিপিবদ্ধ না করায় প্রতিষ্ঠানের‘বৃহৎ আর্থিক’ অনিয়ম হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। বিধি বহির্ভিূত ভাবে দুটি ব্যাংক হিসাব পরিচালনা করায় বিদ্যালয়েল প্রধান শিক্ষক সহ ম্যানেজিং কমিটির দোষ দেখছেন তদন্ত কর্মকর্তা। এছাড়া সরকারি বিধান অনুসারে ভবন নির্মাণের ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ না করে প্রধান শিক্ষক শাস্তিযোগ্য অপরাধ করেছেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়। বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের নামে অনিয়ম, বিধি-বিধান লংঘন, স্বেচ্ছাচারিতা, আর্থিক অনিয়ম এবং উপবৃত্তি প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের থেকে টিউশন ফির অতিরিক্ত বেতন আদায়ের ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তের জন্য বর্তমান ম্যানেজিং কমিটি ও প্রধান শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নিতে তদন্ত কর্মকর্তা সুপারিশ করেছেন।

এ বিষয়ে আজ বৃহস্পতিবার (১৫ নভেম্বর) সরাইল উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সহিদ খালিদ জামিল বলেন, অরুয়াইল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের নানা অনিয়ম তদন্তে প্রমাণিত হয়। তাদের বিরুদ্ধে দুটি তদন্ত প্রতিবেদন ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এসব তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে শিক্ষাবোর্ড ইতিমধ্যে তাদেরকে কারন দর্শানোর চিঠি দিয়েছে। যার অবগতির চিঠি আমার দফতরেও এসেছে।

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech