‘নীল কাজল রাঙা সুন্দর চোখের মেয়েটি’

  

পিএনএস ডেস্ক : মেয়েটিকে প্রথম দেখি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওরিয়েন্টেশন উইকে। আপাদমস্তক নীল রঙের বোরকায় ঢাকা। শুধু চোখ জোড়া দেখা যায়। বোরকার রঙের সঙ্গে মিলিয়ে গাঢ় নীল রঙের কাজল। মেয়েটি ওর উচ্ছলতা দিয়ে সহজেই সকলের নজর কেড়ে নিয়েছিল।

নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য যেসব ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছিল তার সবগুলোতেই মেয়েটির প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ সবাইকে মুগ্ধ করেছে। ক্রিকেট খেলা নিয়ে যে ইভেন্টটি ছিল, তাতে সবাইকে অবাক করে দিয়ে ব্যাট হাতে দাঁড়িয়ে গেল মেয়েটি। আশ্চর্য হলেও সত্যি, সেই ইভেন্টে সর্বোচ্চ স্কোরার হয়েছিল নীল কাজল রাঙা সুন্দর চোখের মেয়েটি।

সন্ধ্যার সময় বিশাল হলঘরে যখন নতুনদের মধ্য থেকে কাউকে কিছু বলার জন্য আহ্বান করা হলো, মেয়েটিকে দেখলাম সাবলীল ভঙ্গিতে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে। ব্রিটিশ অ্যাকসেন্টে ওর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য এতই চমৎকার ছিল যে, আমাদের দর্শকদের হাততালি যেন থামছিলই না।

বক্তব্য শুরুর আগে নিজের সম্পর্কে বলতে গিয়ে মেয়েটি জানাল তার নাম মরিয়ম বেগম। ডেনমার্ক থেকে এক সেমিস্টারের জন্য এক্সচেঞ্জ স্টুডেন্ট হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছে ল পড়তে। এখান থেকে ইংল্যান্ডে যাবে পরের সেমিস্টারের জন্য। পড়াশোনা শেষ করে ফিরে যাবে নিজের দেশ বাংলাদেশে।

বাংলাদেশের মেয়ে শোনার সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণ গর্ববোধ করছিলাম। বাংলাদেশের জন্য কাজ করতে চায় শুনেই আনন্দে চোখজোড়া হঠাৎ​ই ভিজে এল। ওরিয়েন্টেশন অনুষ্ঠানের ব্যস্ততায় মরিয়মের সঙ্গে কথা বলা হয়ে ওঠেনি আমার আর। এরপর সেমিস্টার পুরোদমে শুরু হলে কাজের ব্যস্ততার জন্য কোনদিকেই তাকানোর তেমন ফুরসত মিলছিল না। মরিয়মের খোঁজ নেব নেব করেও সেমিস্টার প্রায় শেষ হয়ে এল।

একদিন অফিসে বসে ফাইনাল পরীক্ষার প্রশ্নপত্র তৈরি করছিলাম, হঠাৎ​ই পরিষ্কার বাংলায় শুনলাম, আপু কি বিজি, ভেতরে আসব?

তাকিয়ে দেখি দরজার ওপারে সাদা রঙের বোরকায় ঢাকা মরিয়ম। নদীর টলটলে জলে ভরা শান্ত দুজোড়া চোখ। হেসে বললাম, নিশ্চয়ই আসতে পার। ওরিয়েন্টেশনের পর তোমার সঙ্গে কথা বলব বলব করেও বলা হয়ে ওঠেনি।

মরিয়ম বলল, আপনি বাংলাদেশি জানার পর আমিও দেখা করব ভেবেছিলাম, কিন্তু পড়াশোনার চাপে সময় করতে পারছিলাম না।

তারপর এ-কথা, সে-কথা অনেক কথার মাঝেই উচ্ছল মরিয়ম আমাকে আপনি থেকে তুমি করে বলার অনুমতি নিয়ে নিল। প্রাণবন্ত মরিয়মকে সত্যি অনেক আপন লাগছিল আমার।

মরিয়মকে বললাম, তোমার চোখ এত সুন্দর! বিষণ্ন কণ্ঠে মরিয়ম বলল, আমি একসময় দেখতেও খুব সুন্দর ছিলাম।

আমি দুষ্টুমি করে বললাম, তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে যেন বুড়ি হয়ে গেছো! পাস্ট টেন্সে কথা বলছ কেন? এই না বললে তোমার কুড়ি বছরের বার্থ ডে সেলিব্রেট করলে গত মাসে। বাঙালি মেয়ে বলেই কি কুড়িতেই বুড়ি হয়ে গেলে নাকি?

কোনো কথা না বলেই মরিয়ম ওর ব্যাগ থেকে একটা খাম বের করে দিল আমার হাতে। খুলে দেখি মরিয়মের ছবি। স্কুলের ড্রেসে লম্বা দুই বেণিতে মরিয়ম, তিস্তা ব্যারেজের পাশে মরিয়ম, বাবা-মার সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল মরিয়ম, সরিষা খেতের হলুদের মাঝে লাল শাড়িতে কিশোরী মরিয়ম, স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পুরস্কার নিচ্ছে মরিয়ম। ওর ছবি দেখে বললাম, তুমি তো দেখতে হুবহু আমাদের সাকিব-আল-হাসানের বউ শিশিরের মতো।

খুব-ই সুন্দর। মরিয়ম হো হো করে হেসে বলল, যেই দেখেছে সেই এ কথা বলেছে। এরপর হাসি থামিয়ে আরেকটা খাম দিয়ে বলল, এবার এটা দেখো।

মরিয়মের দেওয়া খামটি খুলেই দেখি বাংলাদেশের কিছু পত্রিকার কাটিং। সিঙ্গেল কলামের হেডিং পড়ে চমকে উঠলাম আমি। রূপই কাল হলো মরিয়মের, অ্যাসিডে ঝলসে গেল মেধাবী মরিয়ম। আমার আর খবর পড়ার মতো অবস্থা ছিল না। চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল।

ধারা বিবরণীর মতোই মরিয়মের কণ্ঠে শুনছিলাম তিস্তা পাড়ে বেড়ে ওঠা মরিয়মের শৈশব। স্কুলের প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হাওয়া মরিয়মের কৈশোর, মেধাবী মরিয়মকে নিয়ে তার কৃষক বাবার স্বপ্ন।

আরও শুনতে পেলাম কীভাবে ওর জীবন অতিষ্ঠ করে তুলেছিল স্থানীয় প্রভাবশালী মেম্বারের ছেলে তোতা মিয়া। কীভাবে তোতা মিয়া তার সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে ওদের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল।

ক্লাস সেভেনে পড়ুয়া মেয়ের বিয়ে জীবন থাকতেও দেবে না শুনে তোতা মিয়ার মরিয়মের জীবন শেষ করে দেবার হুমকি। শুনতে পেলাম কীভাবে রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত মরিয়মের ওপর ছুড়ে দেওয়া হলো অ্যাসিড। ঝলসে গেল মরিয়ম, সেই সঙ্গে তার স্বপ্ন।

এরপরের জীবন যেন আরও দুঃসহ। ঝলসে যাওয়া শরীরের যন্ত্রণার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছিল গ্রামের লোকের তির্যক কথা। যেন অ্যাসিডে ঝলসানোর জন্য সব দায় মরিয়মের। মামলা করলে ছোট ভাইবোনদেরও মরিয়মের মতো হাল হবে প্রভাবশালীর এই হুমকিতে মরিয়মের বাবা মামলা পর্যন্ত করতে পারেননি।

মরিয়মের জীবনটা হয়তো এভাবেই শেষ হয়ে যেত যদি না ডেনমার্কের দাতা সংস্থা ওর উন্নত চিকিৎসার ভার না নিত। দাতা সংস্থায় কর্মরত নিঃসন্তান চিকিৎসক দম্পতির কারণেই ওকে ডেনমার্কে নিয়ে আসা হয়।

ওনারাই মরিয়মের দেখভালের দায়িত্ব নেন। কিছুটা সুস্থ হলে মরিয়ম পড়াশোনা শুরু করে। নতুন পরিবেশে, নতুন ভাষায় পড়াশোনা শুরু করলেও মেধাবী মরিয়ম খুব তাড়াতাড়ি মানিয়ে নিয়েছিল।

অতীতের দুঃসহ জীবনটাকে দ্রুত ভুলে গিয়েই কিশোরী মরিয়ম আবার তার কৈশোর ফিরে পায় ডেনমার্কে। সারা শরীর বোরকায় ঢেকে রাখলেও ছবি আঁকা, পিয়ানো শেখা, খেলাধুলা, সাইকেল চালানো, বরফের ওপর স্কি করা এমনকি আইস স্কেটিংও শিখেছে মরিয়ম।

হাইস্কুল শেষ করে মরিয়ম আইনে উচ্চশিক্ষা নেবার জন্য ডেনমার্কের একটি নামকরা ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। ইচ্ছে আছে আইন পড়া শেষে বাংলাদেশে ফিরে গিয়ে ওর মতো অসহায় মেয়েদের জন্য কাজ করবে।

গলার কাছে দলা পাকানো কান্নাটাকে অনেক কষ্টে আটকে রেখে ঝাপসা চোখে চেয়ে বললাম, তোমার মাথায় হাত রেখে একটুখানি আদর করতে দেবে মেয়ে?-প্রথম আলো।

পিএনএস/জে এ মোহন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech