রাস্তায় লুটোপুটো খাওয়া ইজ্জত এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন?

  

পিএনএস (নিজামুল হক বিপুল) : আচ্ছা, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনটি কী ‘খেলো’ হয়ে যাচ্ছে? যেভাবে আইনটির অপব্যবহার শুরু হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে আইনটা অসার হয়ে যাচ্ছে। অথচ আইনটা করার সময় আমাদের মাননীয় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক আশস্ত করে বলেছিলেন এই আইনের কোন অপব্যবহার হবে না, অপপ্রয়োগ হবে না। সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে তো নয়-ই। কিন্তু এখন আমরা দেখছি তার উল্টো। ঠুনকো কারণেই তথ্য প্রযুক্তি আইনে মামলা করা হচ্ছে যখন-তখন। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর শিকার হচ্ছেন দেশে কর্মরত সাংবাদিক ও সম্পাদকরা। রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, রিলিফের ত্রাণ চোর এমনকি পরিবহন শ্রমিকরাও মামলা করছেন। কোথাও কোথাও সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা করতে বাদী হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে সাংবাদিকদেরকেই। এই আইনে গত প্রায় দুই মাসে যে পরিমান মামলা হয়েছে সাংবাদিক-সম্পাদকদের বিরুদ্ধে তাতে মনে হচ্ছে, করোনা ভাইরাসের চেয়ে দ্রুত বেগে এগোচ্ছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়েরের ঘটনা।

করোনাভাইরাসের এই অস্বাভাবিক সময়ে লকডাউন চলাকালে সাংবাদিক ও সম্পাদকদের বিরুদ্ধে যেসব মামলা দায়ের হয়েছে তার অন্যতম কারণ হচ্ছে মানহানি। আমাদের দেশের কতিপয় রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, চাল চোর, রিলিফ চোর, দুর্নীতিবাজদের মান-সম্মান এতোটাই ঠুনকো যে, তাদের এসব দুর্নীতি, অনিয়মের খবর সংবাদপত্রের পাতায়, অনলাইন সংবাদ মাধ্যম কিংবা ইলেকট্রনিক সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হলে কিংবা কেউ যদি প্রকাশিত সংবাদ তার ফেসবুকে ট্যাগ করে দেন তাহলেই তাদের মান-সম্মান, ইজ্জত চলে যায়, রাস্তায় লুটোপুটো খায়। তারা যখন দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার করেন তখন নিজেদের মানসম্মানের কথা একটুও চিন্তা করার সময় পান না। গণমাধ্যমে তাদের এসব অপকর্মের সংবাদ প্রচার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের ইজ্জত চলে যায়, দৌড়াদৌড়ি শুরু করে। তখন প্রকাশিত সেই সংবাদের প্রতিবাদ না করে সরাসরি চলে যান থানায় মামলা ঠুকে দিতে। তাও যেনতেন ধারায় মামলা নয়, একেবারে ডিজিটলার নিরাপত্তা আইনে মামলা। ভাবটা এমন দেখ বেটা, রিপোর্ট করছিস এবার ঠেলা সামলা। তাদের এমন আচরণ দেখে মনে হচ্ছে,যেন আইনটা করা হয়েছে এসব দুর্নীতিবাজদের ইজ্জত রক্ষার জন্য।

লকডাউন শুরু হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় দরিদ্র মানুষের ত্রাণ বা প্রধানমন্ত্রীর দেয়া উপহার চুরির অভিযোগে এখন পর্যন্ত অন্তত ৭৫ জন জনপ্রতিনিধি বরখাস্ত হলেন। স্থানীয় সরকার বিভাগ সরাসরি দুর্নীতির অভিযোগে তাদেরকে বরখাস্ত করল, বেশ কয়েকজন কারাগারেও গেলেন তখন কী উনাদের ইজ্জত যায়নি? এলাকায় উনাদের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি হয়নি? বরখাস্ত হওয়ার পর তো সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ডিসি বা ইউএনও’র বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করা তো দূরের কথা নূন্যতম প্রতিবাদ করতেও দেখলাম না কাউকে। তাহলে কী দাঁড়ালো- আপনাদের সমালোচনা করলে, দুর্নীতি, অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে শুধুমাত্র সংবাদ প্রকাশ করলেই যতদোষ! মান-সম্মান, ইজ্জত সব চলে যায়। আর বরখাস্ত হলে, কারাগারে গেলে ইজ্জত বাড়ে!

পুলিশ সদর দপ্তর, গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা আর্টিকেল ১৯ এর প্রতিবেদন অনুযায়ি গত মার্চ থেকে মে পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছে কমপক্ষে ৪৫টি। আর এসব মামলায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন অন্তত ১৩ জন সাংবাদিক। অথচ ২০১৯ সালে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়েছিল ৬৩টি।

গত প্রায় দুই মাসে বেশ কিছু মামলা হয়েছে। এরমধ্যে ত্রাণের চাল চুরি সংবাদ প্রকাশ করায় ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গি উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোমিনুল ইসলাম ভাসানী একটি মামলা দায়ের করেন অনলাইন পোর্টাল বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডট কম সম্পাদক তৌফিক ইমরোজ খালেদী ও জাগো নিউজ২৪ ডট কম’র ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মহিউদ্দিন সরকারের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় দুটি অনলাইনের স্থানীয় প্রতিনিধিদেরকেও আসামী করা হয়। ‘আমার হবিগঞ্জ’ পত্রিকার সম্পাদক সুশান্ত দাশ গুপ্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন গত ২১ মে ভোরে নিজের অফিস থেকে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, হবিগঞ্জ সদর আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য ও হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্য আবু জাহিরের বিরুদ্ধে পত্রিকায় অপপ্রচার চালাচ্ছেন। করোনাকালে হবিগঞ্জের সকল পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ থাকলেও সুশান্ত গুপ্ত তার পত্রিকার অনলাইন প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছেন। এটা তার অপরাধ। আরও অভিযোগ, তিনি বিভিন্ন সময়ে তার পত্রিকার অনলাইন সংস্করন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অসত্য সংবাদ প্রচার করে আসছেন।

হবিগঞ্জের এই মামলায় বাদী কিন্তু সংসদ সদস্য কিংবা তার দলের কর্মী নয়, বাদী আরেক সাংবাদিক সায়েদুজ্জামান জাহির। যিনি হবিগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং আরটিভি’র হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি। তাকে সাংবাদিক না বলে আপাতত বলা ভালো তিনি স্থানীয় সংসদ সদস্যের একনিষ্ঠ এবং অন্ধ কর্মী। আমি কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না একজন সংসদ সদস্যের এমন অন্ধকর্মী কিভাবে সাংবাদিক হন আবার প্রেসক্লাবেরও সাধারণ সম্পাদক হন?

সুশান্ত তার পত্রিকার অনলাইন প্রকাশনা অব্যাহত রেখে করোনাকালে প্রতিদিন দেশ-বিদেশে এবং স্থানীয়ভাবে ঘটে যাওয়া ঘটনা পাঠককে সরবরাহ করতে পারছেন। এটা খুবই ভালো খবর। সংকটময় সময়ে একরকম চ্যালেঞ্জ নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করে তথ্য মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া চাট্টিখানি কথা না। এতে প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক তথা একটি টিভি চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধির সমস্যাটা কোথায়? তার গাত্র দাহ হচ্ছে কেন? তিনি কেন জ্বলেপুড়ে অঙ্গার হচ্ছেন?

তবে হবিগঞ্জে সুশান্তের বিরুদ্ধে স্থানীয় সংসদ সদস্যের হয়ে কোন সাংবাদিক কর্তৃক মামলা দায়েরের ঘটনা এই প্রথম নয়। ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর সংসদ সদস্য আবু জাহিরের মানহানির অভিযোগ এনে এনটিভি’র হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হারুনুর রশদি চৌধুরী তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন ২০০৬ (সংশোধন) ২০১৩ এর ৫৭(২) ধারায় হবিগঞ্জের অপর দুই সাংবাদিক সমকালের (তৎকালীন) জেলা প্রতিনিধি বর্তমানে দৈনিক দেশ রূপান্তরের শোয়েব চৌধুরী ও প্রথম আলোর জেলা প্রতিনিধি হাফিজুর রহমান নিয়নের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ওই মামলায় শোয়েব চৌধুরী তিন মাস জেলও খেটেছেন। বর্তমানে ওই মামলা উচ্চ আদালত দ্বারা স্থগিত আছে।

অবশ্য হবিগঞ্জের সাংবাদিকদের একটা বড় অংশ তথা স্থানীয় প্রেসক্লাব নিয়ন্ত্রণ করেন সংসদ সদস্য আবু জাহির। এরও একটা কারণ আছে, তিন বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্থানীয় দেশ জমিন পত্রিকার সমম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি ছিলেন আবু জাহির। ওই সূত্রে তিনি প্রেসক্লাবের আজীবন সদস্যও। কে প্রেসক্লাবের সভাপতি হবে, কে সাধারণ সম্পাদক হবে- এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় প্রেসক্লাবের সদস্যরা নিতে পারেন না। প্রেসক্লাবের নেতৃত্ব নির্বাচন হয় পর্দার আড়াল থেকে। এর ফলে স্থানীয় সংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদেরকেই ব্যবহার করা হয়। অর্থাৎ হবিগঞ্জ প্রেসক্লাব আর ‘প্রেসক্লাব’ নাই। কারণ সেখানে পেশাদার সাংবাদিকদের কোন কর্তৃত্ব নেই। সাংবাদিক নামদারী অপসাংবাদিক,রাজনৈতিক নেতার লেজুরবৃত্তিকারী দালালদের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাই এর নাম পাল্টে ‘এমপি ক্লাব’ দিলেই বেশি মানানসই হতো।

গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে সিরাজুল ইসলাম রতন নামে এক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন জেলা বাস,মিনিবাস কোচ ও মাইক্রোবাস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতা ও ফাতেমা পরিবহনের মালিক আবদুস সোবহান বিচ্ছু। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে গত ১২ মে এই মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ রতনকে ২৬ মে সকালে তার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করেছে। আদালত তার জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠিয়েছেন। রতনের অপরাধ লকডাউনের মধ্যে সরকারি নিষেধাজ্ঞার পরও বাস চালানোর ঘটনার সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। তার মানে, দাঁড়ালো বিচ্ছু’রা অপরাধ করবে বুক ফুলিয়ে, কিন্তু কেউ তার সমালোচনা করতে পারবে না। সমালোচনা করলে জেলে যেতে হবে।

এর আগে শফিকুল ইসলাম কাজল গ্রেপ্তার হয়েছিলেন গত ২ মে শনিবার দিবাগত রাতে। পরদিন ৩ মে ছিল বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, ২ মে গভীর রাতে যশোরের বেনাপোল সীমান্তে জিরো পয়েন্ট এলাকা থেকে বাংলাদেশে অবৈধ অনুপ্রবেশ (!) করার অভিযোগে কাজলকে গ্রেপ্তার করে আমাদের সীমান্তরক্ষীরা। বিষয়টা খুবই ইন্টারেস্টিং। ভারতে থেকে অনুপ্রবেশ! ভারতীয় বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কাজল জিরো পয়েন্টে চলে আসছেন। এটা বোধ হয় আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় সফলতা। গ্রেপ্তারের পর তাকে পুলিশ হেফাজতে দেওয়া হয়। আমরা দেখেছি, কাজলের দুই হাত পিছ মোড়া করে হ্যান্ডকাপ লাগানো হয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়েছে, এই ফটো সাংবাদিক ভয়ঙ্কর দুর্ধর্ষ অপরাধী। পালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে। এরমধ্য দিয়ে কী সাংবাদিকদের বুঝিয়ে দেয়া হল বেশি বার বাড়বে না।

কাজল নিখোঁজ হয়েছিলেন ১০ মার্চ রাজধানী ঢাকায় নিজের পত্রিকা ‘পক্ষকাল’ অফিসের নিচ থেকে। গত ৯ মার্চ ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একজন সংসদ সদস্যের দায়ের মামলায় কাজলকে আসামী করা হয়েছিল। পর দিনই তিনি নিখোঁজ হন।

দেশের এই দুর্যোগময় সময়ে, মহামারীর কালে যারা সম্মুখসারির যোদ্ধা তাদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন সাংবাদিকরা। চিকিৎসক, নার্স, পুলিশ,মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং সাংবাদিকরাই এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত মাঠে আছেন। অথচ নিজেদের অপকর্মের কারণে কথিত মান-ইজ্জত হারানো নেতা, ব্যক্তি ও রিলিফ চোর জনপ্রতিনিধিরা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একের পর এক মামলা করছেন। যার মধ্য দিয়ে শুধু আইনটিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে না, সরকারের সফলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন