‘বড় হয়ে চিকিৎসক হও, এটি দোয়া নাকি বদ দোয়া?’

  

পিএনএস (ডা. সাকলায়েন রাসেল) : সত্যি কথা বলতে গেলে এমবিবিএস ভর্তির সময় জানতাম না পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতেই হবে, আবার পোস্ট গ্রাজুয়েশন এ আসার আগে জানতাম না আমার ডিসিপ্লিনে ৯-১০ টা সাব-স্পেশালিটি হবে। তখন এটাও জানতাম না বিসিএস করে কেরানী হতে হবে। বিসিএস যখন হলো তখন এটাও জানতাম না যে বেতন পেতে কত বেগ পেতে হয়।

এই পোস্ট ১৫ বছর আগে জানতে পারলে এতক্ষনে নিজের ইচ্ছামত বেল টিপে চা খেতে পারতাম, তাও করতে পারতাম কিনা আমার জানা নাই।

আসলে কিছুই জানি না তাই উপরমহল যা বলে সেই ঘানি টানি।

তুমি কি চিকিৎসক হবে?
ভেবে বলছো?
সত্যিই ভেবে বলছো?

আসো না একটু ভাবি

ক. তুমি কি জানো, ২০১৯ এর খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী ফেল না করলেও এমবিবিএস শেষ করতে তোমার ৭ বছর লাগবে? এরপর উচ্চতর ডিগ্রী নিতে আরও ৫ বছর।

খ. এর মধ্যে এমএস বা এমডি কোর্সে ভর্তি হতে এমবিবিএস পাশের পর ২ বছর অপেক্ষা করতে হবে। মানে ৭+২+৫ = ১৪ বছর।
গ. এখানেই শেষ কথা নয়, তুমি হয়ত জানোনা উচ্চতর ডিগ্রীতে পাশের হার ১% বা তারও কম। সেক্ষেত্রে উচ্চতর ডিগ্রীতে গড়ে অতিরিক্ত ৩-৫ বছর লাগবে, এর মধ্যে বিয়ে ওগ্রামে ২ বছর পোস্টিং মিলে তোমার আরও ৩ বছর কেটে যাবে। এবার তবে যোগফল দাঁড়াল ১৪+৩+৩=২০ বছর।

ঘ. এরপরেও কথা আছে,তুমি পাশ করা মাত্রই বিশেষজ্ঞ হতে পারবেনা। নির্দিষ্ট বিষয়ে দক্ষতা বাড়াতে তোমাকে আরও ৫ বছর অপেক্ষা করতে হবে। সর্বশেষ ফলাফল ২০+৫ = ২৫ বা কখনো কখনো ২৭ বছরও লেগে যেতে পারে।

ঙ. হিসাবটা আসলে এতটাও সহজ না। উচ্চতর ডিগ্রীর জন্য চান্স পাওয়া কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয়। চান্স পেতেই যদি দেরি হয় তবে বুঝতেই পারছো এ হিসেব কোথায় গিয়ে ঠেকবে?

আচ্ছা তুমি কি এইসএসসি পাশের পর এই ২৫ বছর নিজেকে পড়ালেখায় নিয়োজিত রাখতে প্রস্তুত?

যদি হ্যাঁ হয়, তবে শুন

ক. যতদিনে তুমি এমবিবিএস পাশ করবে ততদিনে তোমার সহপাঠিরা ছাত্রত্ব শেষ করে পেশায় মনোযোগ দিবে।

খ. তুমি যখন উচ্চতর ডিগ্রীতে ভর্তির সুযোগ পাবে ততোদিনে তোমার সহপাঠিরা নতুন প্রমোশন পাবে, বেল চেপে পিয়নকে দিয়ে চা আনাবে।

তুমি কি আরো জানো?

ক. তোমার পিতা সংসারের দায়িত্ব তোমার হাতে তুলে দেয়ার প্রহর গুণতে গুণতে একসময় ইহলিলা সাঙ করবেন।

খ. তুমি একসময় অর্থাভাবে খেতে পারবে না। যখন তোমার অর্থাভাব চলে যাবে তখন তোমার শরীরে ডায়াবেটিস, প্রেসারের মতো রোগ বাসা বাধবে, আর তখনো তুমি খেতে পারবে না !

গ. সামাজিক সব আয়োজন থেকে তুমি থাকবে দূরে। ফলে ধীরে ধীরে মানুষ থেকে অসামাজিক জীবে পরিণত হবে।

ঘ. সন্তানের বেড়ে উঠা দেখার মতো সময়ও তোমার হাতে থাকবেনা।

ঙ. মানসিক বিকাশে বাধাগ্রস্ত শিশুর সংখ্যা চিকিৎসকদের মধ্যেই বেশি ।
চ. এতো কিছুর বিনিময়ে সম্মান?হাহাহাহা, বেশিরভাগ সময় গালিই কপালে জুটবে।

তোমার এটাও জানা উচিত

ক. প্রতি বছর ৮০ হাজারের মতো শিক্ষার্থী মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা দেয়, মাত্র ৭- ১০ হাজারের মতো।

খ. যারা চান্স পায় না তাঁদের অনেকেই অন্য পেশায় যোগ দেয়। চিকিৎসক না হতে পারার আফসোস তাঁদের অন্তরে থাকলেও একসময় তাঁদের অনেকেই চিকিৎসক বিদ্বেষী হয়ে উঠবে। উঠতে বসতে তারা চিকিৎসকদের চৌদ্দগুষ্ঠি উদ্ধার করবে।

তুমি হয়তো জান না

ক. বিদেশ প্রীতি আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি, খেয়াল করলে দেখবা এসব লোক চিকিৎসার জন্য বিদেশের সরকারি হাসপাতালে যায় না, যায় বেসরকারিগুলোতে। তারাই আবার কথায় কথায় তোমাকে কসাই বলতেও কুন্ঠা বোধ করবে না। ভারতের কথাই ভাব, নচিকেতা ভারতের লোক, চিকিৎসকদের কসাই বলেই তিনি বিশেষ স্থান দখল করেছেন। অথচ, তাঁর গান ভারতীয় ডাক্তারদের উদ্দেশ্যেই ছিল।

খ. এদেশের বিবেকবানরা চিকিৎসাবিদ্যা সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান না রাখলেও পান্ডিত্য ফলাতে পিছপা হয় না।

গ. শুধুমাত্র পাশ করছে না বলে প্রতিদিন কতজন যে আত্মহত্যার চেষ্ঠা করে তার কোন পরিসংখ্যান নেই। বেসরকারি মেডিকেলে এ প্রবণতা অনেক বেশি। অনেক টাকা খরচ করে মধ্যপ্রাচ্যে গিয়ে অনেকে আর আসতে চায় না। এতো টাকা নস্ট করে দেশে ফিরে কি করবে সে ভয়ে ফেরারি আসামীর মত লুকিয়ে লুকিয়ে কাজ করে । বেসরাকারি মেডিকেলেও তাই, এতো খরচ করে অনেকে ফেল করতে করতে আত্মহত্যার দ্বার প্রান্তে গিয়েও ফিরে আসে। এই ভেবে যে মা-বাবার এতো টাকা খরচ করল, চিকিৎসক না হলে কি হবে।

ঘ. নিরাপদ কর্মস্থলের অভাবে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও চিকিৎসকরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

ঙ. এদেশে রোগীর চেয়ে চিকিৎসকের সংখ্যা বেশি। ওষুধের দোকানদার ডাক্তার, পল্লি চিকিৎসক বড় চিকিৎসক, পাশের বাড়ীর সব জান্তা আপা তাঁর চেয়েও বড় চিকিৎসক,ঘরে ঘরে কত শত চিকিৎসক, এখন যোগ হয়েছে গুগল চিকিৎসক, গুগলে সার্চ দিয়েই যারা তোমার উপর পান্ডিত্য ফলাবে। এদেশের সব লোকই চিকিৎসক, এদের মধ্যে কেউ কেউ এমবিবিএস পাশ করে।

জানো কি?

ইন্টার্নি ২ বছর হওয়ার প্রস্তাব আসছে।
এক বছর নিজ মেডিকেলে,এক বছর গ্রামে।

শিক্ষানবিশ হয়ে গ্রামে গিয়ে কি করবে ভেবেছো?
শিখবে কার কাছে? রোগীকেই বা কিভাবে সাহায্য করবে?
তবে এক বছর গ্রামে থাকলে কর্তাদের অনেক সুবিধা। গ্রামে ডাক্তার থাকেনা এ অপবাদ কমে যাবে, কারণ তুমি সে শুন্যস্থান পূরণ করবে।

তুমি প্রস্তুত তো?

তুমি কি জানো?
ক. সব পেশাই সেবামূলক কিন্তু তোমাকে সেবাদানকারীর তকমা লাগিয়ে দেয়া হলেও দিনশেষে তুমি তিরস্কারই পাবে।
খ. সব শিক্ষার্থীরাই ট্যাক্স প্রাপ্ত। সবচেয়ে বেশি পায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবুও শুধুমাত্র তোমার ঘাড়ে অপবাদ ঝুলবে ট্যাক্সের টাকায় চিকিৎসক।

এবার বল, তুমি কি সত্যিই চিকিৎসক হতে চাও?
তবে দোয়া করি, তুমি চিকিৎসকই হও!
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এটা দোয়া না বদ দোয়া?-মেডিভয়েস

লেখক : ডা. সাকলায়েন রাসেল, অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর এন্ড অ্যাসোসিয়েট কনসালটেন্ট, ভাসকুলার সার্জারি, ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হসপিটাল এন্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট।

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন