রোজার তাত্ত্বিক শিক্ষা ও আমাদের সংশোধন

  

পিএনএস(এম এ হাসান) : রমজান মাস হল আরবি মাসসমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস। আর রোজা হল ইসলামের পঞ্চস্তম্বের মধ্যে অন্যতম একটি স্তম্ভ। নামাজের পরই ইসলাম রোজার গুরুত্বকে স্থান দিয়েছে। আল্লাহ ও তার রাসুল (স.) এর প্রতি ঈমান বা বিশ্বাস স্থাপনের পরই প্রত্যেক মুসলিমের জন্য এটি ফরজ ইবাদত হিসেবে গণ্য। হজ্জ্ব ও যাকাতের সাথে আর্থিক সচ্ছলতার বিষয়টি জড়িত থাকলেও রোজা সবার ক্ষেত্রে ফরজ। রোজার ফযিলত সম্পর্কে কোরআন ও হাদিসে অনেক বর্ণানা রয়েছে।

আল্লাহর বাণী “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হলো যেভাবে তা ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর। যাতে তোমরা সংযমী হও”। (সূরা বাকারা, আয়াত-১৮৩)।

সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ তায়ালা আরও বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি সেই মাসকে পায় সে যেন রোজা রাখে”।

পবিত্র হাদিসেও রোজার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, রাসুল (সা.) এরশাদ করেছেন, যখন রমজান মাস আসে আসমানের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয় এবং দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়, আর শয়তানকে শৃঙ্খলিত করা হয়। (বুখারী, মুসলিম)

নবী কারীম (সা.) এরশাদ করেছেন, বেহেশতের ৮টি দরজা রয়েছে। এর মধ্যে ১টি দরজার নাম রাইয়ান। রোজাদার ব্যতিত আর কেউ ওই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী, মুসলিম)

অপর এক হাদিসে আছে হুজুর (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি ঈমানের সঙ্গে ও সওয়াবের নিয়তে রমজান মাসের রোজা রাখবে তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।(বুখারী, মুসলিম)

হাদিসে আরো এসেছে, রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, রোজা ছাড়া আদম সন্তানের প্রত্যেকটি কাজই তার নিজের জন্য। তবে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর পুরস্কার দেব। রোজা (জাহান্নামের আজাব থেকে বাঁচার জন্য) ঢাল স্বরুপ।

রোজাদারের খুশির বিষয় ২টি- যখন সে ইফতার করে তখন একবার খুশির কারণ হয়। আর একবার যখন সে তার রবের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রোজার বিনিময় লাভ করবে তখন খুশির কারণ হবে। (বুখারী)।

রোজা অন্যান্য ইবাদত থেকে ব্যতিক্রম। ইসলামের নির্দেশিত সকল ইবাদতে ফাঁকিবাজির সুযোগ থাকলেও রোজার মধ্যে সেটার সুযোগ নেই। রোজাদার রোজা রাখে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কেউ রোজা রেখে যদি লোকচক্ষুর অন্তরালে কিছু খেয়ে ফেলে তাহলে রোজা হবে না। কিন্তু আপনি আমি কিছুই খাই না। কারণ আমরা বিশ্বাস করি যে, কেউ না দেখলেও কেবল একজন সৃষ্টিকর্তা আছেন যিনি মানুষের গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু সমানভাবে দেখেন। আর এজন্যই আমরা গোপনে পানাহার থেকে বিরত থাকি। এটাই হলো আল্লাহভীতি। আর এই আল্লাহভীতি রোজাকে অন্য সকল ইবাদত থেকে ব্যতিক্রমী করেছে।
পবিত্র কোরআন প হাদিসে রোজার গুরুত্ব ও ফযিলতের বর্ণান রয়েছে।

আগামীকাল থেকে বাংলাদেশে রোজা শুরু হচ্ছে। আমরা যদি রোজাকে কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকা, উপবাস বা কামবাসনা থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে রোজার তাত্ত্বিক শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আল্লাহভীতিকে গুরুত্ব দেই তাহলে এটা হবে রোজার বড় শিক্ষা। আল্লাহভীতির কারণে রোজা রেখে দুনিয়ার সর্ব ক্ষেত্রে এই ভীতিটাকে কাজে লাগাই তাহলে রমজানের রোজার শিক্ষা হবে আমদের জন্য পরম প্রাপ্তি। সারাদিনের উপবাস আমাদের ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করার শিক্ষা দেয়। ক্ষুধার্তের ক্ষুধার জ্বালা বুঝার শিক্ষা দেয়।

ইসলামে রোজাকে ফরজ করা হয়নি কেবল উপবাস বা পানাহার থেকে বিরত থাকার জন্য। ইসলাম একটি শাশ্বত জীবন বিধান। ইসলামের সৌন্দর্য মানবজীবনে মঙ্গলের পাথেয়। রোজা হল একটি শারীরিক ইবাদত। সুর্যোদয় থেকে সুর্যাস্ত পর্যন্ত কোনকিছু না খেয়ে সকল কামবাসনা থেকে বিরত থেকে আমরা এটা পালন করি। এই যে সারাদিন না খেয়ে আমরা ক্ষুধার যন্ত্রণা সহ্য করে যেটা উপলব্দি করি এটাই রোজার শিক্ষা। আমাদের সমাজের দরিদ্র, অসহায় লোকেরা প্রতিদিন এভাবে ক্ষুধার যন্ত্রণার মুখোমুখি হয়। রোজার এই তাত্ত্বিক দিকটা বাস্তব জীবনে কাজে লাগিয়ে আমরা যদি ক্ষুধার্তের পাশে দাঁড়াই তাহলে আসছে রমজানের রোজা হবে আমাদের দুনিয়ার শান্তি ও পরকালের মুক্তর উপায়।

রোজাদারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সময় হচ্ছে ইফতারের সময়। হরেক রকমের খাবার সামনে রেখে রোজাদার তার রবের নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করে। বাহারি সব খাবার সামনে থাকার পরও সে না খেয়ে যে অপেক্ষা করে সেটা আল্লাহর কাছে কুবই প্রিয় সময়। সেজন্যই আল্লাহ পাক এই সময়ের দোয়াকে কবুলের নিশ্চয়তা দিয়েছন। এবার যেহেতু একটা কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে সারা পৃথিবী যাচ্ছে। রমজানের এই ইফতারের সময়ে আমরা মহামারি থেকে মুক্তির প্রার্থনা করতে পারি বেশি বেশি।

রমজানের রোজা রাখার পাশাপাশি অন্য কোনো রোজাদারকে ইফতার করালেও একটা রোজা রাখার সমান সাওয়াব পাওয়া যায়। সেদিক দিয়ে এটা একটা মোক্ষম সময়। যারা এতোদিন ক্ষুধার্ত, অসহায় দরিদ্রের সহযোগিতা করেছেন তারা শুধু দান সদকার সাওয়াব পেয়েছেন। এখন ইফতারের ব্যবস্থা করলে দান সাদকার সাওয়াবের পাশাপাশি রোজা রাখার সাওয়াবও পেয়ে যাবেন। তাছাড়া দান সাদকা বাড়িয়ে দেয়া যেতে পারে। কারন অন্যান্য সময় দানের সমপরিমাণ প্রতিদান থাকলেও এসময় রমজান উপলক্ষে প্রতিদানের পরিমান সত্তর গুণ বাড়িয়ে দেয়া হয়।

রোজার একটা বড় দিক হল রোজা আমাদের অন্তরের পাপ পঙ্কিলতা রিপুসমূহকে পুড়িয়ে আমাদেরকে পুত পবিত্র করে দেয়। যেহেতু এখন সবার দোয়ারে মৃত্যু এসে কড়া নাড়ছে। মৃত্যু সম সময়ই অবধারিত তবুও করোনা মহামারি কখন কাকে নিয়ে যায় বলা মুশকিল। সুতরাং এখন নিজেদের পুত পবিত্র করতে পারলে মৃত্যু হলেও পরকালে নাজাত পাওয়া সম্ভব।

গতকাল একটা জনপ্রিয় সংবাদ পত্রে দেখলাম; গত কয়েক দিনে স্থানীয় সরকারের মোট ৩৫ জন জনপ্রতিনিধিকে বরখাস্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে ১৫ জন ইউপি চেয়ারম্যান, ১৯ জন ইউপি সদস্য এবং একজন জেলা পরিষদ সদস্য।

সাময়িক বরখাস্ত করার প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট সংকটের সময় তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি ত্রাণের চাল আত্মসাৎ, জাটকা নিধনে বিরত থাকা জেলেদের জন্য সরকারের বরাদ্দ করা ভিজিএফ চাল আত্মসাৎ ও কালোবাজারে বিক্রি, সরকারি ত্রাণের চাল ভুয়া মাস্টাররোলে বিতরণ দেখিয়ে আত্মসাৎ, সরকারি ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, চাল নির্ধারিত পরিমাণে না দেওয়া এবং বিধিবহির্ভূতভাবে অন্যদের মাঝে বিতরণ ইত্যাদি অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। যারা মানুষকে সহযোগিতা করবে তারা যদি উলটো গরীবের হক মেরে খায় তাহলে এই অসহায় মানুষগুলো যাবে কোথায়! আমরা দেখেছি কিভাবে নষ্ট লোকেরা ঘরের মেঝেতে গরীবের চাল লুকিয়েছ। বক্স খাটের নিচে তেল চুরি করে লুকিয়েছে। সবার সংশোধনের জন্য রমজান হলো উপযুক্ত সময়।

রোজা আমাদের আল্লাহভীতি বাড়িয়ে দেয়। গরীবের হক আত্মসাতের পূর্বে , চাল চুরির পূর্বে যেকোনো দুর্নীতি করার পূর্বে যদি সেই আল্লাহভীতিটা নিজেদের মধ্যে জাগ্রত করি তাহলে রমজানের রোজা রাখা সার্থক হবে। তানাহলে শুধু উপবাসই করা হবে কাজের কাজ কিছুই হবে না।

যারা সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া সুইজারল্যান্ড সহ সারা পৃথিবী ব্যাপী লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা জমিয়েছে সুনিশ্চিত ভবিষ্যতের আশায় তাদের বৈধ সম্পদের বরকত আসুক। আর অবৈধ সম্পদ আল্লাহভীতি আর করোনা উভয়ের সম্মিলিত ভয়ে অসহায়দের পেছেন ব্যয় করার চেতনা জাগ্রত হোক।

সম্পদ কার জন্য রাখবেন? আজ মৃত্যু হলে আপনার পাড়া প্রতিবেশী দূরের কথা আপনার সন্তান স্ত্রী পর্যন্ত কেউ আপনাকে দেখতে আসবে না। আপনার জানাজায় লোক নেই। রমজানের তাত্ত্বিক শিক্ষা কাজে লাগাতে এখনই মোক্ষম সময়। আপনি রমজানের রোজা রাখবেন আল্লাহর ভয়ে। এই আল্লাহভীতি জীবনের সর্বক্ষেত্রে কাজে না লাগালে রমজানের শিক্ষা বিফলে যাবে।

একটা অদৃশ্য শত্রু হাজার হাজার দৃশ্যমান মানুষকে মেরে ফেলছে। আপনার ভেতরের অদৃশ্য পশুত্বকে আপনি মেরে ফেলতে পারেন এই রমজানে। জাগ্রত হোক আমাদের মানবতা। করোনায় মৃত্যু হোক আমাদের পশুত্বের।


লেখক : (এম এ হাসান : সাবেক শিক্ষার্থী ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান ইচ্ছেঘুড়ি ফাউন্ডেশন।)

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন