কঠিন সময় পার করছেন গণমাধ্যমকর্মীরা

  

পিএনএস (সেলিম আহমেদ) : বাংলাদেশের গণমাধ্যম এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। ভালো নেই দেশের অধিকাংশ গণমাধ্যম ও গণমাধ্যমকর্মীরা। রাজধানী থেকে শুরু করে মফস্বল, সব জায়গায় একই অবস্থা। একদিকে নেই চাকরি আর বেতন-ভাতার নিশ্চয়তা। অন্যদিকে নেই নিরাপত্তা। সঠিক খবর তুলে ধরলেই নেমে আসে নির্যাতনের স্ট্রিমরোলার। হামলা, মামলা দিয়ে হয়রানি এমনকি খুনও করা হয় সাংবাদিককে।

সম্প্রতি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক তথ্য অনুযায়ী, সংবাদ প্রকাশের জের ধরে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত গত ১০ বছরে বাংলাদেশে ৩৬ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিচার হয়েছে হাতেগোনা কয়েকটি। গত ১০ বছরে কত সাংবাদিকের ওপর হামলা এবং তাকে ও তার পরিবারকে হুমকি-ধমকি দিয়ে মানসিক চাপে রাখা হয়েছে, বিভিন্ন মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে, গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে গ্রেফতার ও আটক করা হয়েছে, তার কোনো হিসাব নেই।

সবমিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সাংবাদিক সমাজ। সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কথিত রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, পেশাজীবি গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীদের। বিগত দিনে আমাদের দেশে যে সব সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বিচার না হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের জন্য চরম অশনিসংকেত বলে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

সর্বশেষ একটি সংবাদ প্রকাশের জের ধরে কুড়িগ্রামের ডিসি মোছা. সুলতানা পারভীনের রোষানলে পড়েন অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলাট্রিবিউনের কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যান। কুড়িগ্রামের ওই ডিসি শহরের ৪’শ বছরের পুরোনো ‘নিউ টাউন পার্ক’ নামে পরিচিত একটি পুকুরে সরকারি ও ব্যক্তিপর্যায়ের অনুদানে সংস্কার করে তার নাম অনুসারে ‘সুলতানা সরোবর’ নামে নামকরণ করেন। এতেই বাধে বিপত্তি। জেলায় এতো বিখ্যাত লোক থাকতে জনগণের টাকায় প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারি কিভাবে পুকুরটি তার নামে নামকরণ করে তা বোধগম্য হয়নি সচেতন মহলের। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে ছিল দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ।

বিষয়টি নিয়ে বাংলাট্রিবিউনে একটি প্রতিবেদন করেন আরিফুল ইসলাম। এতেই ক্ষিপ্ত হন ডিসি মোছা. সুলতানা পারভীন। শুক্রবার মধ্যরাতে বাড়িতে হানা দিয়ে দরজা ভেঙে ঘরে প্রবেশ করে তাকে তুলে নিয়ে যায় জেলা প্রশাসনের মোবাইল কোর্ট। বাসা থেকে জোর করে তুলে আনার পথে জেলা প্রশাসক কার্যালয় পর্যন্ত তার উপর চলে লাথি-থাপ্পর, কিল-ঘুষি। একটি কক্ষে নিয়ে গিয়ে প্রথমে তার দুই চোখ কাপড় দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়। এরপর প্যান্ট ও গেঞ্জি খুলে তাকে বিবস্ত্র করে চলে অকথ্য নির্যাতন।

এ সময় আরিফুলের বাসায় আধা বোতল মদ ও দেড়শ’ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেছে বলে দাবি করেন তারা। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে তাকে এক বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। অবশ্যই রোববার তার জামিন দিয়েছেন আদালত। প্রশ্ন দেখা দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এই সাজা কতটা বৈধ। এই সাজার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিবসহ সংশ্লিষ্ট ১৭ জনকে রিটে বিবাদী করা হয়।

এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে যখন পুরো বাংলাদেশে নিন্দার ঝড় উঠেছিল ঠিক তখনই ঢাকায় সাংবাদিক মাহবুব আলম লাভলুর বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা দায়ের করেছেন পুরান ঢাকার বাসিন্দা আশিকুর রহমান। তার বিরুদ্ধে অনুমতি ছাড়া তথ্য সংগ্রহ করে ইউটিউবে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে মিথ্যা ও মানহানিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এর আগে ‘মানবজমিন’-এর প্রধান সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী, স্টাফ রিপোর্টার আল আমিনসহ ৩২ জনের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা টুকেছেন সরকারদলীয় সাংসদ সাইফুজ্জামান শিখর। কিন্তু যে খবরের জন্য মামলাটি হয়েছে, তার কোথাও সাইফুজ্জামান শিখরের নাম নেই। মামলাটি বাক-স্বাধীনতা তথা সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপের শামিল।

তারপরও মানলাম মানবজমিনের রিপোর্ট নিয়ে এমপি শিখরের কোনো বক্তব্য আছে। তাহলে তিনি সেটি ‘মানবজমিন’-এ পাঠিয়ে দিতে পারতেন। তারা তা ছাপাতে বাধ্য ছিল। কিন্তু তা তিনি পাঠাননি। খবরটি আপত্তিকর মনে হলে সাংসদ প্রেস কাউন্সিলে মামলা করতে পারতেন। প্রেস কাউন্সিলের রায়ে সন্তুষ্ট না হলে ফৌজদারি আদালতের আশ্রয় নিতে পারতেন। সেটাই নিয়ম। কিন্তু ক্ষমতাসীন দলের সাংসদ এসব নিয়মকানুন মানবেন কেন? ডিজিটাল আইনের মোক্ষম অস্ত্রটিই তিনি প্রথম সুযোগে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবহার করলেন।

এছাড়া বেশ কয়েকদিন যাবৎ সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজল নিখোঁজ রয়েছেন। তার বিষয়ে আইন-শৃংখলা বাহিনীর কোনো দিতে পারছে না।

সবমিলিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে সাংবাদিক সমাজ। সংবাদপত্র রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হলে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে কথিত রাজনীতিবিদ, সরকারি আমলা, আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী, পেশাজীবি গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে হচ্ছে গণমাধ্যমকর্মীদের।

বিগত দিনে আমাদের দেশে যে সব সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন তাদের বিচার না হওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর নির্যাতন, হয়রানি ও আক্রমণের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাগুলো গণমাধ্যমের জন্য চরম অশনিসংকেত বলে বলেও মনে করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

গণমাধ্যমকর্মীদের ‘পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে’। এখন এর থেকে উত্তোরণে পথ খুঁজতে হবে। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন করতে হবে গণমাধ্যমকর্মীদের সর্বমহল থেকে। না হলে কাল আপনার ওপর নেমে আসবে নির্যাতনে স্ট্রিমরোলার।

সেলিম আহমেদ : সাংবাদিক।
ইমেইল : selimnews18@gmail.com

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন