এখনকার দিনে মানুষ মানুষকে পেটায় সাপের মতো!

  



পিএনএস ডেস্ক: সাপ পেটানো দেখেছেন? ছোট সময় দু-একবার হয়তো নির্মম এই হত্যায় শামিলও হয়েছেন কেউ কেউ। গ্রামে এটি খুব পরিচিত দৃশ্য। সাপ মারা শেষে লাঠির মাথায় নিয়ে ছেলেপুলে এ-পাড়া থেকে ছুটে যেত ও-পাড়ায়। দেখানোর জন্য, কী গৌরবের কাজ করেছে তারা! সাপ পিটিয়ে মেরেছে! সহজ কথা নয়।

এখনকার দিনে মানুষ মারা হচ্ছে সাপের মতো। রীতিমতো খেলা শুরু হয়েছে মানুষের জীবন নিয়ে। পশুপাখির চেয়েও মূল্যহীন মানুষের জীবন! কিছু নয়, কেবল সন্দেহ! সন্দেহের বশে পিটিয়ে মারা হচ্ছে মানুষ। এসব আবার ভিডিও করে ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ কেমন সমাজ! কী হচ্ছে এসব!

কী সহজেই না ঘটছে সব! ‘পদ্মা সেতুতে মাথা লাগবে। রক্ত লাগবে।’ স্রেফ গুজবে কান দিয়ে সচেতন মানুষ অচেতনের মতো আচরণ করছেন। এখন যে কাউকে দেখলে সন্দেহ হচ্ছে ‘কল্লাকাটা’ বলে। কী নারী, তরুণ বা মাঝবয়সী। আগপিছ না দেখে, না ভেবে অতর্কিতে আক্রমণ। তার দেখাদেখি অন্যরা হামলে পড়ছে। কী বীভৎস সেই দৃশ্য! দেখার মতো না এমন কাজ চলছে। কে নিরাপদ? যারা মারছেন তারাও যদি অন্য কারও কাছে সন্দেহের পাত্র হন, তখন?

মেয়েকে স্কুলে ভর্তির জন্য গিয়েছিলেন রেনু বেগম। স্বামীর সঙ্গে সম্পর্কের ছেদ হয়েছে বছর কয়েক আগে। দুই সন্তান নিয়ে থাকতেন মহাখালীতে। বাড্ডায় এক স্কুলের সামনে ছেলেধরা সন্দেহে ওই নারীকে পিটিয়ে মেরেছে উত্তেজিত জনতা। ভিডিওটি ভাইরাল হয়েছে। এক তরুণকে দেখা যাচ্ছে শরীরের তাবত শক্তি দিয়ে পেটাতে। একটুও দম নিচ্ছে না। একের পর এক আঘাত করে যাচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে ক্ষ্যান্ত দিল পেটানোতে। ততক্ষণে ওই নারী মরে নিথর হয়ে গেছেন।

বাকপ্রতিবন্ধী! সেও রেহাই পেল না। নারায়ণগঞ্জে ছেলেধরা সন্দেহে তাকেও পিটিয়ে মারল জনতা। আসলেই কি তারা মানুষ? ছেলেটির কাছে কী যেন জানতে চেয়েছিল তারা। ছেলেটি বলতে পারেনি। হায়! যে কথা বলতে পারে না, সে জবাব দেবে কী করে! বাকপ্রতিবন্ধিতা কাল হলো তার।

সাভারের তেঁতুলজোড়ায় হিংস্র মানুষের পিটুনিতে মৃত নারীর পরিচয় পায়নি পুলিশ। ওই ঘটনায় মামলা হয়েছে। আসামি ৮০০। অজ্ঞাত। হায়, কী নির্মম ভাগ্য! সন্তানরা হয়তো পথ চেয়ে আছে মায়ের জন্য। তারা তো জানে না মা আর নেই। কিংবা মেয়ের পথ চেয়ে আছে বাবা-মা। জানে না কী নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে তাকে। প্রকাশ্যে। শত শত মানুষ উল্লসিত, উচ্ছ্বসিত। মানুষের জীবন কি শিশুর খেলনা?
নেত্রকোনায় এক তরুণকে পিটিয়ে মারার দৃশ্য দেখে অনেকে সংবিৎ হারিয়েছেন। গাছের গুঁড়ি, মুগুর দিয়ে মানুষকে এভাবে পিটিয়ে মারার দৃশ্য আগেপরে দেখেনি কেউ। কী নৃশংস! কী নির্মম! কী বর্বর! ঘটনাচক্রে ছেলেটির কাছে থাকা ব্যাগে কাটামুণ্ডু মিলেছে। তাকে পুলিশে দেওয়া যেত। ওই হত্যা কে ঘটিয়েছে, কেন ঘটিয়েছে, তার কারণ জানা যেত। এতে হয়তো অনেক অজানা জানা হতো। উন্মোচন হতো অনেক রহস্য। বেরিয়ে আসত আসল ঘটনা। গুজবের সুরাহা হতো। তা তো হলো না। ছেলেটাকে পিটিয়ে মারায় কী সমাধান মিলল?

বস্তায় করে মাছ নিয়ে যাচ্ছিলেন জেলেরা। লোকেরা সন্দেহ করল ব্যাগে ‘কাটামুণ্ডু’। সন্দেহপ্রবণ জনতা হইহই করে ছুটল। ছয়জনকে ধরে গণপিটুনি দেওয়ার পর বস্তা খুলে দেখা গেল, মাথা কোথায়, এ তো মাছ! সন্দেহপ্রবণ কিছু মানুষের কারণে ওই ছয়জন এখন মৃত্যুশয্যায়। ‘মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই’ কথাটা ভিত্তিহীন হলেও তারা তা-ই করছেন। রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বেড়িবাঁধ এলাকাতেও কল্লাকাটা সন্দেহে গণপিটুনিতে মরেছে দুজন। গুরুতর আহত একজন।

এই গুজবের শেষ কোথায়? এভাবে কি চলতেই থাকবে? শিশুদের দেখে যেসব মানুষ আবেগী হয়ে পড়েন, তারা এখন বড় ঝুঁকিতে। বিপদে পড়লেও মানুষ এখন আর কারও কাছে ছুটে যাবে না। সামান্য গুজবে বিশ্বাস করে কী ভয়ংকর এক খেলায় মেতেছি আমরা। এখন যদি আপনার, আমার সন্তান কখনো পথে বিপদে পড়ে, কেউ যদি এগিয়ে না আসে, কী হবে ভেবেছেন? ছেলেধরা সন্দেহের ফাঁদে কে চাইবে নিজের জীবন দিতে?

আমরা এতটাই মূর্খ, অমানুষ, বর্বর, পাষণ্ড, অসভ্য হয়ে উঠেছি? ভাবা যায়? কে নিরাপদ? আপনি? আমি? কেউ না। ঘটনাচক্রে আপনিও হতে পারেন সন্দেহপ্রবণদের শিকার। হ্যাঁ, অন্যায় করলে বিচার হবে। অপরাধীকে আটকে পুলিশে দিন। মূল ঘটনার জন্য অপরাধীকে জেরা হতে পারে। জিজ্ঞাসাবাদ হতে পারে। তার পরিচিত বা পরিবারের সদস্যদের খুঁজে বের করা যেতে পারে। আপনি বলবেন, এত সময় কোথায়? পুলিশে দিলে যে বিচার হবে নিশ্চয়তা কী?

এসব প্রশ্নের উত্তর যা-ই হোক, কেবল সন্দেহের বশে অন্ধের মতো মানুষ হত্যা কি যৌক্তিক? একবার কি ভেবেছেন আমাদের অন্ধ আচরণের কারণে কত সন্তান তার মা-বাবাকে হারাচ্ছেন? কত বাবা-মা হারাচ্ছেন সন্তান? বিচারে যদি প্রমাণ হয় ওই ব্যক্তি অপরাধী ছিলেন না, পারবেন সন্তানকে বাবা-মার কাছে ফিরিয়ে দিতে? মানুষের জীবন তো ফেলনা নয়। এতটা নির্মম হওয়ার আগে একবার নিজেদের দিকে তাকাচ্ছি আমরা? বিচারহীনতার দায় দিয়ে এভাবে মানুষ হত্যা চলতেই থাকবে? রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বলতে কি কিছু নেই? আছে কোনো উত্তর, সন্দেহপ্রবণ জনতার কাছে?
লেখকঃ হাবিবুল্লাহ ফাহাদ

পিএনএস/হাফিজুল ইসলাম

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech