বঙ্গবন্ধুর আদর্শ এবং বর্তমান রাজনীতি

  

পিএনএস (আহমেদ জামিল): আদর্শ ও মূল্যবোধ ছাড়া রাজনীতি হয় না। একেক দলের আদর্শিক ভিত্তি একেক রকম। সেসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু আদর্শহীন রাজনীতি ভ্রষ্টাচার মাত্র। এ ভূখণ্ডে রাজনীতির নামে ভ্রষ্টাচারের সূচনা পাকিস্তানের জন্মের সঙ্গে। সামরিক শাসনের মাধ্যমে তা পূর্ণতা পায়।

আইয়ুব-ইয়াহিয়ার ভ্রষ্ট রাজনীতি এ দেশের মানুষ মোকাবেলা করেছে মূল্যবোধের ও আদর্শের রাজনীতির মাধ্যমে। সে লড়াইয়ে আওয়ামী লীগও ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশে ভ্রষ্টাচারী রাজনীতি আর থাকবে না, এমন আশাই করা হয়েছিল। এমন আশা রাজনীতিকরা দিয়েছিলেনও।

সেই আশা পূরণ হয়েছে কি? আওয়ামী লীগে স্বাধীনতার পর দলটিতে আদর্শহীন, সুবিধাবাদী লোকের ভিড় জমে। পঁচাত্তরের পর তারা দ্রুত সটকে পড়ে। সামরিক শাসকরা তাদের বগলদাবা করে আরো পুষ্ট করে তোলে। স্বাধীনতাবিরোধী এবং আদর্শচ্যুত বামপন্থীরাও তাদের পকেট পার্টিতে ভেড়ে। এসব দলের আদর্শ ছিল না, এখনো নেই। তাদের ছিল এবং আছে কিছু ‘সুবিধাজনক’ কর্মসূচি।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে জাতি হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান বাঙ্গালী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।জাতির জনককে সপরিবারে হত্যা এবং স্বাধীনতার চেতনাকে মুছে ফেলার অপচেষ্টায় এক কালো অধ্যায়ের সূচনা করে ঘৃণিত ঘাতকরা।

আজ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন নিয়ে, বঙ্গবন্ধুর আর্দশ নিয়ে সর্বত্র চলছে আর্দশহীন রাজনৈতিক ক্ষমতার লোভ ও স্বার্থের খেলা। পরিস্থিতি এমন হয়ে গেছে বঙ্গবন্ধুর নাম নিয়ে অনিয়ম, সন্ত্রাস, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, ব্যাংক হরিলুট, সরকারি বাস, বিমান, কারখানা, অফিস, রাস্তা নির্মাণে সর্বত্র আজ দুর্নীতি। যেন বঙ্গবন্ধুর নাম ও ছবি থাকলে সাত খুন মাফ!

বঙ্গবন্ধুর ভাষায় এরা কারা? বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমার কৃষক, আমার শ্রমিক, আমার জনগণ চোরাকারবারি করে না, ঘুষ-দুর্নীতি করে না। এসব করে শিক্ষিতরা। বিদেশের এজেন্ট আমার সাধারণ জনগণ হয় না। এজেন্ট হয় স্যুট-টাই পরা ইংরেজি জানা শিক্ষিতরা।

এখন যারা এসব করেন বঙ্গবন্ধু আগেই বলে দিয়েছেন এরা কারা। তবে এখন এসব করছেন বঙ্গবন্ধুর নাম দিয়ে আর্দশহীন কিছু কুচক্রী কাউয়া, হাইব্রিডরা। তাদের কাছে ‘বঙ্গবন্ধু’ নাম একটি নিরাপদ সাইনবোর্ড, যা ব্যবহার করে ফায়দালুটেরা সক্রিয় রয়েছে। অথচ তাদের চরিত্রে বঙ্গবন্ধুর আর্দশের ‘আ’ আছে কি না? তা নিয়েও গবেষণা প্রয়োজন!

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি তাঁর চিন্তা ও চেতনার প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে যারা রাজনীতি করেন, তারা মুখে দেশপ্রেম বলে, অন্যদিকে ক্ষমতার লোভে নিজের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে বাড়ী-গাড়ি করতে ব্যস্ত।

রাজনীতিতে জনগণের অনুভূতিকে লালন না করে, বঙ্গবন্ধুর আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা নয় কি? দেশপ্রেমের নামে নিজের প্রেমে মগ্ন বললে মনে হয় বেশি একটা ভুল হবে না। মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের চেয়ে নিজের ভাগ্য উন্নয়নে, বিত্ত-বৈভব ক্ষমতা ও ভোগ বিলাসে মত্ত বঙ্গবন্ধুর আর্দশের নামে আর্দশহীন হাইব্রিডরা। যারা বঙ্গবন্ধুর আর্দশ নিয়ে রাজনীতি করেন, সংগ্রাম করেন, তাঁরা আর্দশহীন হাইব্রিডদের দাপটে অনেক দূরে থাকতে হয়।

একসময় যারা আওয়ামী লীগের কঠোর সমালোচনা করত, আওয়ামীবিরোধী রাজনীতি করত, সেই বিএনপি-জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী স্বার্থ হাসিলের জন্য যোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগে। অনেকে সরাসরি বিএনপি বা জামায়াত থেকে, অনেকে জামায়াত থেকে বিএনপি হয়ে আওয়ামী লীগে ভিড়েছে। তাদের অনেকে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কমিটিতে পদও বাগিয়ে নিয়েছে পুরনো, ত্যাগী বা আদর্শবাদী আওয়ামী লীগারদের হটিয়ে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী লোকগুলো আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে রাতারাতি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক হয়ে গেছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা তারাই বেশি বলে।

সূত্রে মতে, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানের ঘটনা ঘটেছে দুই ধাপে। প্রথমে ২০০৯ সালে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর। দ্বিতীয় ধাপে ২০১৪ সালে, চারদলীয় জোটের সরকারবিরোধী সহিংস আন্দোলন ব্যর্থ হওয়ার পর। আওয়ামী লীগে যোগদানের ঘটনা ঘটেছে ৮৩টি। ৬২টি ঘটনা একই সঙ্গে জামায়াত ও বিএনপির নেতাকর্মীরা এবং ২১টি ঘটনায় শুধু বিএনপির নেতাকর্মীরা যোগ দেয়। যোগদানের ৬০টি ঘটনাই ঘটেছে ২০১৪ সালের পর। বিএনপি থেকে ২৫ হাজার নেতাকর্মী ঢুকেছে আওয়ামী লীগে।

আওয়ামী লীগের একটি আদর্শ রয়েছে, তারা মূল্যবোধচালিত দল। সভানেত্রী নিজে বলেছেন, জামায়াত-বিএনপির লোকদের যেন দলে ঢুকতে দেওয়া না হয়। দলের শীর্ষ নেতাদের মুখেও এমন কথা শোনা যায়। তাহলে আদর্শহীনতার এত বড় চালান কী করে ঢুকল? এ প্রবণতা দলের জন্য তো নয়ই, দেশের জন্যও মঙ্গলজনক নয়।

বর্ষীয়ান আদর্শবাদী নেতারা নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন, তাঁরা হতাশ ও ক্ষুব্ধ। অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দল বলে যাঁরা আওয়ামী লীগের ওপর আস্থা রাখেন, তাঁদের জন্যও বিষয়টি হতাশাজনক। আওয়ামী লীগ কি আদর্শবাদী পরিচয় ধরে রাখতে পারবে?

আগস্টকে ঘাতকরা তাদের নিষ্ঠুর টার্গেটের মাস হিসেবে বেছে নিয়েছে বারবার। ১৯৭৫ সালের এ মাসে যেমন বাঙালিরা হারিয়েছে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, তেমনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড ছুঁড়ে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল জাতির জনকের কন্যা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। ভাগ্যক্রমে সেদিন তিনি বেঁচে গেলেও এই ঘটনায় প্রায়ত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমানের সহধর্মিণী, আওয়ামী লীগের তৎকালীন মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা আইভি রহমানসহ ২৪ জন নিহত এবং পাঁচ শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হন।

টাইমস অব লন্ডন-এর ১৯৭৫ সালের ১৬ আগস্ট সংখ্যায় বলা হয় ‘সবকিছু সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধুকে সবসময় স্মরণ করা হবে। কারণ তাঁকে ছাড়া বাংলাদেশের বাস্তব কোন অস্তিত্ব নেই।’

একই দিন লন্ডন থেকে প্রকাশিত ডেইলি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় বলা হয়, ‘বাংলাদেশের লাখ লাখ লোক শেখ মুজিবের জঘন্য হত্যাকাণ্ডকে অপূরণীয় ক্ষতি হিসেবে বিবেচনা করবে।’

বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের একটি দুর্নীতি মুক্ত, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাই পারে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান ও আস্থা বিশ্বাস রাখা।

কিউবার প্রেসিডেন্ট বিপ্লবী ফিদেল কাস্ত্রোর কথাই ধরুন৷ তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি হিমালয় দেখিনি, আমি শেখ মুজিবকে দেখেছি৷''

ব্রিটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রস্ট (১৯৭২ সালের এক সাক্ষাৎকারে) বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘‘আপনার শক্তি কোথায়?'' বঙ্গবন্ধু সে প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘‘আমি আমার জনগণকে ভালোবাসি৷'' ‘‘আর আপনার দুর্বল দিকটা কী?'' বঙ্গবন্ধুর উত্তর, ‘আমি আমার জনগণকে খুব বেশি ভালোবাসি৷''

এই হলেন বঙ্গবন্ধু৷ জনগণের অন্তর্নিহিত শক্তির ওপর অপার আস্থা-বিশ্বাস, মানুষের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা, মমত্ববোধ, সহমর্মিতার বিরল দৃষ্টান্ত সমৃদ্ধ মানুষ – বঙ্গবন্ধু৷

পিএনএস/জে এ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech