সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে বাংলাদেশ

  

পিএনএস ডেস্ক: দেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৮ মার্চ। এই এক মাসে রোগী শনাক্ত হয়েছেন ১৬৪ জন। মারা গেছেন ১৭ জন। ইতিমধ্যে ১৭টি জেলায় সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। ঢাকার ৫২টি এলাকা লকডাউন করেছে কর্তৃপক্ষ। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সামাজিক দূরত্ব কার্যকর করতে চলছে সাধারণ ছুটি।

চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের সংক্রমণের ধারা পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, প্রথম রোগী শনাক্ত হওয়ার পরবর্তী এক মাসের কিছু আগে-পরে সংক্রমণের পরিমাণ বেড়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন সেই সময়ের মুখোমুখি।

পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বক্তব্য আসার পর। বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, গতকাল মঙ্গলবার সকালে চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, করোনাভাইরাস বিশ্বব্যাপী প্রলয় সৃষ্টি করেছে। তিনি বলেন, ‘সারা বিশ্বে যেভাবে করোনা রোগী বৃদ্ধি পেয়েছে, বৃদ্ধি পাওয়ার একটা ট্রেন্ড (প্রবণতা) আছে। তাতে আমাদের সময়টা এসে গেছে, এপ্রিল মাসটা। এই সময়টা আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।’

দেশবাসী করোনা পরিস্থিতি জানতে পারছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) কাছ থেকে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা গতকাল বলেন, এখন সংক্রমণ পরিস্থিতির ক্রান্তিকাল। দেশ সংক্রমণের তৃতীয় স্তর থেকে চতুর্থ স্তরের দিকে যাচ্ছে, এটা বলা যায়।

রোগ সংক্রমণের চতুর্থ স্তরে পৌঁছানোর অর্থ, করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হবে বহু মানুষ, বহু মানুষকে হাসপাতালে যেতে হবে, মৃত্যুর সংখ্যা বাড়বে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ক্রান্তিকালে করোনা মোকাবিলায় দেশের প্রস্তুতি কোন পর্যায়ে। সংক্রমণের হার কি প্রস্তুতির তুলনায় বেশি? স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, সব দেশের মতো বাংলাদেশও এই ভাইরাসের পেছনে আছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও এর ব্যাপকতার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের দেশগুলোকে চারটি স্তরে ভাগ করেছে। একজনেরও সংক্রমণ শনাক্ত না হওয়া দেশ স্তর-১-এ। বিদেশ থেকে আসা ব্যক্তি শনাক্ত হওয়া ও তাঁদের মাধ্যমে দু-একজনের সংক্রমণ, স্তর-২। নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় সংক্রমণ সীমিত থাকলে তা স্তর-৩। আর স্তর-৪ হলো সংক্রমণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়া।

৮ মার্চ বাংলাদেশ প্রথম ঘোষণা করে, দেশে কোভিড-১৯ আক্রান্ত ব্যক্তি আছে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ সংক্রমণ পরিস্থিতির দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছায়। সংক্রমিত ব্যক্তিরা ছিলেন বিদেশফেরত। এটাকে স্থানীয় সংক্রমণ বলা হয়।

এই বিদেশফেরত ব্যক্তিদের মাধ্যমে বেশ কিছু মানুষ সংক্রমিত হচ্ছে এমন বলতে থাকে আইইডিসিআর। কিন্তু দুই সপ্তাহ আগে রাজধানীর টোলারবাগ এলাকায় একটি সংক্রমণের ইতিহাসে দেখা যায়, সংক্রমিত ব্যক্তির বিদেশ ভ্রমণ বা বিদেশফেরত ব্যক্তির সংস্পর্শে আসার ইতিহাস নেই। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল, সংক্রমণ কি তাহলে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে?

এরই মধ্যে ৫ এপ্রিল সংক্রমণের তৃতীয় স্তরে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশ এমন বক্তব্য দেন আইইডিসিআরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা। তিনি বলেন, রাজধানীর টোলারবাগ ও বাসাবো, নারায়ণগঞ্জ, মাদারীপুর (শিবচর) ও গাইবান্ধা (সাদুল্লাপুর)—এই পাঁচটি এলাকায় গুচ্ছ আকারে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে।

এ ছাড়া জামালপুর, চট্টগ্রাম, চুয়াডাঙ্গা, কুমিল্লা, কক্সবাজার, গাজীপুর, মৌলভীবাজার, নরসিংদী, রংপুর, শরীয়তপুর ও সিলেটে সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছে। এ থেকে অনেকেই মনে করেন, সংক্রমণ এখন ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। কত মানুষ আক্রান্ত, তার সঠিক হিসাব এখনো জানা যায়নি। কারণ, নমুনা পরীক্ষার পরিধি ও সংখ্যা এখনো খুবই কম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম বলেন, সংক্রমণের যে তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তাতে একে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন (ব্যাপক জনগোষ্ঠীতে সংক্রমণ) বলতে বাধা নেই। তবে মীরজাদী সেব্রিনা বলেছেন, সংক্রমণ পরিস্থিতি চতুর্থ স্তরে কি না, তা কোভিড-১৯ বিষয়ক কারিগরি কমিটির বৈঠকে সিদ্ধান্ত হবে।

দেশ ভাইরাসের পেছনে
এখন প্রশ্ন উঠেছে, ভাইরাসের সংক্রমণের চেয়ে বাংলাদেশ কি পিছিয়ে? এই প্রশ্নের উত্তর একেকজন একেকভাবে দিয়েছেন। প্রত্যেকেই সরকারের গৃহীত ব্যবস্থা ও পরীক্ষার ফলাফলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।

দেশে এখনো রোগ শনাক্তকরণ পরীক্ষা কম হচ্ছে। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশে এ পর্যন্ত মাত্র ৪ হাজার ২৮৯ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৪ জন শনাক্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়েছেন ৩৩ জন। নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে মাত্র ১৪টি ল্যাবরেটরিতে। সারা দেশ থেকে এখনো নমুনা সংগ্রহ করতে পারছে না স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। যে নমুনা আসছে, তার মান নিয়েও প্রশ্ন আছে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৬৭৯টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। আইইডিসিআর ল্যাবরেটরিতে ১৫৭টি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে, শনাক্ত হয়েছেন ৩০ জন। বাকি ৫২২টি পরীক্ষা হয়েছে ১৩টি ল্যাবরেটরিতে। শনাক্ত হয়েছেন ১১ জন। শনাক্তের হার ২ শতাংশ। জেলা ও উপজেলা থেকে আসা কিছু নমুনা পরীক্ষা করা যায়নি, কারণ সেগুলো বিধি অনুযায়ী সংগ্রহ করা হয়নি। তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, নমুনার মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা আছে। সঠিক বিধি মেনে যেসব নমুনা আসেনি, সেগুলো পরীক্ষা করা হয়নি।

সরকার এ পর্যন্ত মাত্র ৯টি হাসপাতালকে কোভিড-১৯ চিকিৎসার জন্য নির্ধারণ করেছে। এসব হাসপাতালে শয্যাসংখ্যা ১ হাজার ৩৩০। জটিল কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় আইসিইউর দরকার হবে। কিন্তু সরকারি ও বেসরকারি খাতে মোট আইসিউই শয্যা আছে ১ হাজার ২০০-এর কম। রোগী বাড়লে তা কীভাবে সরকার সামাল দেবে, তা নিয়ে সংশয় আছে সরকারসহ সব মহলে।

বেসরকারি চাইল্ড হেলথ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সমীর সাহা বলেন, ভাইরাসের সংক্রমণ যে হারে ছড়াচ্ছে, তাতে বলার সুযোগ নেই যে দেশ ভাইরাসের আগে আছে।

পরিস্থিতি খারাপ হচ্ছে এ কথা স্বীকার করছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহামারিবিষয়ক প্রস্তুতি কমিটির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মাহদুদুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ঠিক এই মুহূর্তে বাংলাদেশ ও ভাইরাস সমান্তরাল অবস্থানে আছে।’ তিনি মনে করেন, সামাজিক দূরত্ব তৈরি করার সরকারি উদ্যোগ সময়োপযোগী। তবে একে জোরদার রাখতে হবে।

একাধিক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ২৬ মার্চ থেকে ছুটির সিদ্ধান্ত মোটামুটি ঠিকই ছিল। তবে পোশাককর্মীদের ঢাকায় আসতে দেওয়ার বিষয়টি ঠিক হয়নি। এতে সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।

ভিন্নমত দিয়েছেন আইইডিসিআরের পরামর্শক মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী যে স্তরে যে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, বাংলাদেশ তার আগেই সে পদক্ষেপ নিয়েছে। বাংলাদেশ যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে, তাতে সংক্রমণের গতি শ্লথ হবে। এর অর্থ সংক্রমিত মানুষ বাড়লেও হাসপাতালের ওপর চাপ কম পড়বে।

তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ বলেছেন, ‘ভাইরাসটি এমন যে এর আগে থাকার কোনো সুযোগ নেই।’ তিনি আরও বলেন, রোগ শনাক্তকরণ, আইসোলেশন ব্যবস্থা বা চিকিৎসা সবই করতে হচ্ছে সংক্রমণ ঘটে যাওয়ার পর। তবে সংক্রমণ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপের নেওয়া হয়েছে। মানুষকে সেই পদক্ষেপে শামিল হতে হবে। সূত্র: প্রথম আলো

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন