‘কার মান ভাঙাতে হবে সেটা জানি না’

  

পিএনএস ডেস্ক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক মান-অভিমান ভাঙাতে কোনো উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এখানে মান-অভিমানের কিছু নেই, এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন। এখানে কে মান, অভিমান করল, কার মান ভাঙাতে হবে সেটা আমি জানি না। সহানুভতি দেখাতে যেতে যদি অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়, সেখানে আর যাবার ইচ্ছা আমার নেই।’

আজ বুধবার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে জাতীয় পার্টির (জাপা) সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা এসব কথা বলেন।

ফখরুল ইমাম বলেন, ‘একটা পিছিয়ে পড়া জাতিকে উন্নয়নে ভাসিয়ে দেওয়ার নাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। দেশের এত উন্নয়ন হয়েছে, যার রূপকার অবশ্যই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এটা নিয়ে কারোর মনে কোনো প্রশ্ন নেই। তবে দেশে যে রাজনৈতিক মান-অভিমান চলছে, বাড়তে থাকা দূরতে ক্ষোভের পাহাড় জমছে। রাজনৈতিক এই সমস্যা রোহিঙ্গা ইস্যুর চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। এটা ভাঙাতে প্রধানমন্ত্রী কোনো উদ্যোগ নেবেন কি না?’

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখানে মান-অভিমানটা কোথা থেকে আসল আমি জানি না। এটা হচ্ছে নীতির প্রশ্ন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন, আর হচ্ছে আইনের প্রশ্ন। কেউ যদি অন্যায় করে, কেউ যদি অর্থ আত্মসাৎ করে, কেউ যদি চুরি করে, কেউ যদি খুনের প্রচেষ্টা করে, গ্রেনেড মারে, বোমা মারে তার বিচার হবে এটাই স্বাভাবিক।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘রাজনীতি সবাই করে যার যার নিজস্ব আদর্শ নিয়ে, আর দেশটা সকলের, দেশটা আমাদের একার নয়। যারাই রাজনীতি করবেন দেশের প্রতি, দেশের জনগণের প্রতি তাদের একটা দায়িত্ববোধ থাকতে হবে। সেই দায়িত্ববোধ থেকেই তাদের কর্মপন্থা ঠিক করবেন এবং কাজ করবেন এটা হলো বাস্তব। আমরা রাজনীতি করি আমাদের নিজেরে স্বার্থে নয়, নিজের লাভ- লোকসানের জন্য নয়। সেই বিচার করি না, সেই হিসাবও করি না। হিসাব করি জনগণের জন্য কতটুক দিতে পারলাম, জনগণের কতটুক করতে পারলাম। জনগণের জীবনমান কতটুক উন্নত হলো এটাই আমরা দেখার চেষ্টা করি। আর সেভাবেই পদক্ষেপ নেই, পরিকল্পনা সেই ভাবেই বাস্তবায়ন করি। নিস্বার্থভাবে দেশের মানুষকে ভালোবেসে দেশের মানুষ জীবনমান উন্নয়নে, জনকল্যাণে কাজ করি বলেই আজ এত অল্প সময়ে, এত উন্নয়ন করতে পেরেছি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে অনেক সরকার ছিল। এত অল্প সময়ে এত উন্নয়ন কে করতে পেরেছে? পারেনি কেউ, কেন পারেনি? সেখানে ব্যক্তি স্বার্থকে দেশের জনগণের স্বার্থের চাইতে বড় করে দেখা হত। আমি ব্যক্তিগত হিসাব-নিকাশ করি না। আন্তরিকতার সাথে কাজ করছি বলেই দেশটাকে উন্নতি করতে পারছি। আমাদের উন্নয়ন এখন গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত হয়েছে। দেশকে উন্নয়নের ছোয়া দিতে পেরেছি সেটাই সব থেকে বড় পাওয়া। এখানে কে মান, অভিমান করল, কার মান ভাঙাতে হবে সেটা আমি জানি না। সহানুভুতি দেখাতে যেয়ে যদি অপমানিত হয়ে ফিরে আসতে হয়, সেখানে আর যাবার কোনো ইচ্ছা আমার নেই। এতটুক বলতে পারি।’

বিশ্বচাপে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে মিয়ানমার
সরকারী দলের সাংসদ ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তিন দফা চুক্তি এবং আশ্বাস দিলেও মিয়ানমার সরকার তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে তেমন উদ্যোগী হচ্ছে না। কিন্তু বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক প্রধান সাফল্যেই হচ্ছে আমরা রোহিঙ্গা ইস্যুতে বিশ্বজনমত সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছি। সারা বিশ্বের নেতারাই একমত পোষণ করে বলেছেন, রোহিঙ্গাদের ওপর অন্যায় করা হয়েছে এবং মিয়ানমার সরকারকে তাদের ফেরত নিতেই হবে।’

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘চীন, রাশিয়া ও ভারতও রোহিঙ্গা ইস্যুতে বলেছে মিয়ানমারের উচিত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়া। চীন ও ভারত রোহিঙ্গাদের জন্য ঘর-বাড়ি নির্মাণেও সাহায্য দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতও মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নির্যাতনের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আমরা ভাসানচরে রোহিঙ্গাদের রাখার জন্য ঘর-বাড়ি নির্মাণ করছি। বিমসটেক সম্মেলনের সময় মিয়ানমারের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনার সময়ও তিনি রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবেন বলে জানিয়েছেন। তবে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আন্তর্জাতিক চাপের মুখেই মিয়ানমার তাদের নাগরিক রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে বাধ্য হবে।’

জাপার নুরুল ইসলাম মিলনের প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত বিপুল রোহিঙ্গা জনস্রোতের নজিরবিহীন এক মানবিক সংকটে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে সাড়া দিয়ে সীমান্ত উন্মুক্ত রেখে তাদের প্রবেশ করতে দিয়েছে। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদে অবস্থানের কোনো সুযোগ নেই। আমরা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তাদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে চাই। আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ফলে, রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে নিরাপদ, সম্মানজনক ও টেকসই প্রত্যাবাসন সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।’

ঢাকার চতুর্দিকে এলিভেটেড রিংরোড হবে
অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে আমরা সব মহাসড়কই ৪-লেনে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করে যাচ্ছি। রাজধানী ঢাকার যানজট নিরসনে চারপাশ্বে এলিভেটেড রিং রোড করা হবে। এছাড়া পাতাল রেল নির্মাণের জন্য সমীক্ষা চলছে। পাতাল রেল নির্মাণেরও আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এক সময় রেল ছিল মৃতপ্রায়। সেই রেলকে আমরা পুনরুজ্জীবিত করেছি। আলাদা মন্ত্রণালয় করে অর্থ বরাদ্দ দিয়ে রেলের উন্নয়নের জন্য পদক্ষেপ নিয়েছি। সারা দেশেই রেলের নেটওয়ার্ক গড়ে আমরা সেগুলো পুনরায় চালু করেছি। আকাশ পথেও উন্নয়নে নতুন নতুন বিমান কিনেছি। ছয়টি নতুন বিমান কিনেছি। আরও একটা আসবে। অভ্যন্তরীন ও আঞ্চলিক রূপে চলাচলের জন্য আরও কয়েকটি ছোট বিমান ক্রয় করা হবে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘মাত্র সাড়ে ৯ বছরে আমরা দেশের যত উন্নয়ন করেছি, তা বলতে গিয়ে টানা কয়েকদিন সময় লাগবে। একদিনে বলে শেষ করা যাবে না।’

সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল হবে
সরকার দলীয় সংসদ সদস্য মামুনুর রশিদ কীরনের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিমূলক বা উস্কানীমূলক পোস্ট, ভিডিও প্রচারকারীকে সনাক্ত করার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনতে সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল গঠনসহ প্রয়োজনী কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রতীতির দেশ হিসেবে বিশ্বে যে সুনাম অর্জন করেছে তা ধরে রাখতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার বদ্ধপরিকর। কোনো গোষ্ঠী বা দল যাতে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, দল যাতে গুজব বা বিভ্রান্তিমূলক তথ্য প্রচার করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা বিঘ্নিত করতে না পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’

পিএনএস/মোঃ শ্যামল ইসলাম রাসেল

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech