হাত হারা এক জীবন যোদ্ধার কথা! (ভিডিওসহ)

  

পিএনএস ডেস্ক:শারীরিক প্রতিবন্ধকতাও যে জীবন সংগ্রামে মানুষকে পরাজিত করতে পারে না তার অন্যতম উদাহরণ মদন লাল। ভারতের হরিয়ানার এই ব্যক্তি দু’হাত ছাড়াই এই পৃথিবীতে এসেছিলেন। হাতের বদলে দুই পা’কে সম্বল করে বড় হয়ে উঠতে থাকেন। হাতের অভাব পা দিয়ে তিনি মেটাতে পারলেও সমাজ কিন্তু তার এই সংগ্রামকে প্রথমে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেনি।

পড়াশোনা করার ইচ্ছাও ছিল মদনের। কিন্তু স্কুল তার শারীরিক অবস্থা দেখে ভর্তি নিতে চায়নি। যা গভীরভাবে দাগ কাটে মদন লালের মনে।

বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দু’হাতের অভাব পা দিয়েই মেটাতে দক্ষ হয়ে উঠতে থাকেন মদন লাল। আর প্রতিজ্ঞা করেন একদিন এই শারীরিক প্রতিবন্ধকতাকে জয় করে সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবেন।

এক সময় ঠিক করেন তিনি টেইলারিং’র কাজ শিখবেন। সেটাকেই নেবেন পেশা হিসেবে। কিন্তু কাজ শেখার জন্য যাবেন কার কাছে? ছেলেবেলার স্কুলের অভিজ্ঞতা তো মদন লালের আগেই হয়ে গেছে! পোশাক কারিগরের মতো কঠিন কাজ যে কেউ তাকে শেখাতে আগ্রহ দেখাবে না তা বুঝতে পেরেছিলেন তিনি।

কাজেই অনেক টেইলর মাস্টারের কাছে গেলেও ফিরে আসতে বাধ্য হন তিনি। সবাই তার শারীরিক অবস্থা দেখে মুখ ফিরিয়ে নেয়। কিন্তু দমে যাননি মদন লাল। শিক্ষক হিসেবে একজন আদর্শ পোশাক কারিগরের খোঁজে যেতে লাগলেন কাছে-দূরে সবখানে!

একপর্যায়ে ফতেহাবাদে দেখা পান এক শিক্ষকের। যিনি তাকে কাজ শেখার সুযোগ করে দেন। প্রথম দিকে অবশ্য সেই টেইলার মাষ্টারও তাকে ফিরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন! বলেছিলেন, ‘যে কাজ দু’হাত দিয়েই করা কঠিন সেখানে তোমার জন্য তা অসম্ভব হবেই।’ কিন্তু দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মদন লাল যোগ্যতা প্রমাণের একটি মাত্র সুযোগ চান!

শেষ পর্যন্ত মুখ ফিরিয়ে নেননি সেই সেই পোশাক কারিগর। দিয়েছিলেন আশ্রয় আর কাজ শেখার সুযোগ। মদনের ইচ্ছাশক্তি আর কাজ দেখে ১০/১৫ দিন বাদে সেই শিক্ষকই বলতে বাধ্য হন, ‘তোমাকে দিয়ে হবে মদন লাল। তুমি আসলেই উন্নতি করবে।’

নিরাশার দুনিয়ায় মদন লালের জন্য এই বাক্য দু’টি যেন নতুন করে প্রেরণা জোগায়! টানা এক বছর প্রশিক্ষণের পর সেখান থেকে চলে আসেন তিনি। একজন দক্ষ পোশাক কারিগরে পরিণত হয়ে।

গ্রামে ফিরে টেইলারিং’র দোকান খোলেন মদন লাল। সাজিয়ে তুলতে চান নতুন জীবন! কিন্তু বাঁধ সাধে সমাজের মানুষেরা।

গ্রামের মানুষেরা বিশ্বাসই করতে চায়নি দু’পা দিয়ে মদন পোশাক গড়তে পারবেন। দু’হাত ছাড়া একজন মানুষ কিভাবে শরীরের মাপ নিয়ে, পোশাক কেটে, মেশিনে ফেলে তা সেলাই করতে পারে? গ্রামের মানুষের হাসি ঠাট্টার সঙ্গে সঙ্গে এমন প্রশ্নই শুনতে হতো মদনকে।

বেশ কিছুদিন বাদে অবশ্য গ্রামের মানুষের এই হাসি ঠাট্টাই বিস্ময়ে পরিণত হয়! ধীরে হলেও গ্রামের মানুষের আস্থা জয় করতে সক্ষম হন মদন লাল। তার তৈরি পোশাকের সুনাম গ্রামের গণ্ডি ছাড়িয়ে আশপাশের এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের নায়কে পরিণত হন দু’হাত হারা জীবন সংগ্রামী মদন লাল।

এখন পুরনো দিনের কষ্টের কথা মনে করতে চান না পোশাক কারিগর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত মদন লাল। বর্তমানকে নিয়ে তিনি খুব খুশি।

তবে কিছু আক্ষেপ তার রয়েই গেছে! নিজের এই সংগ্রামী জীবনে পাশে তেমন কাউকেই পাননি। বরং ঠাট্টা তামাশার মাধ্যমে তার মনোবলকে ভেঙ্গে ফেলতে চেয়েছিল সমাজের মানুষেরা। এই কারণে মদন স্বপ্ন দেখেন প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য কাজ করার।

মদন চান সরকার যদি তার মতো শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেয়, তবে সমাজের এই অংশটি কারও বোঝা হয়ে থাকবে না। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে তারাও রাখতে পারবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

পিএনএস/আলআমীন

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech