করোনাকালের আশা জাগানিয়া বাজেট ঘোষণা আজ

  

পিএনএস ডেস্ক : অর্থমন্ত্রী এমন একসময় নতুন বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন যখন করোনাভাইরাসের প্রভাবে অর্থনীতি তছনছ। থমকে গেছে সব উন্নয়ন কর্মকান্ড। মহামারির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে মহামন্দা। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশের অর্থনীতির সূচকও মুখ থুবড়ে পড়েছে। উৎপাদন ও সেবাখাত প্রায় অচল। এ অবস্থায় থমকে গেছে রাজস্ব আয়ও।

এমনই এক নাজুক পরিস্থিতিতে আজ বিকাল ৩টায় অর্থনৈতিক অভিঘাত মোকাবিলার লক্ষ্য নিয়ে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে (২০২০-২১) অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদে এ বাজেট উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ সময় সংসদে উপস্থিত থাকবেন।

বর্তমান সরকারের আমলে অর্থমন্ত্রী হিসেবে এটি তার দ্বিতীয় বাজেট। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এ বাজেটে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হচ্ছে স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে। এজন্য সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েও বড় বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। অর্থনীতিবিদরা বলেন, এ বাজেট যেন হয় জীবন ও জীবিকার বাজেট, টিকে থাকার বাজেট।

এদিকে সংসদে বাজেট পেশের ইতিহাসে এবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিস্থিতিতে বিধি-নিষেধ ও কড়াকড়ি আরোপ করে বাজেট অধিবেশন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। করোনা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য

ঝুঁকির বিবেচনায় বাজেট উত্থাপনের দিন বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে বাজেট প্রত্যক্ষ করার আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী বাজেটে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের ওপর। পাশাপাশি করোনা থেকে উত্তরণের দিকনির্দেশনাও থাকবে বাজেটে। করোনার প্রভাবে মানুষের আয় কমে গেছে। তাই নতুন অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটে মানুষের ওপর নতুন করে করের বোঝা চাপানো হবে না। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেওয়া হবে ছাড়। প্রান্তিক মানুষকে সেবা দিতে সামাজিক নিরাপত্তার আওতা আরও বাড়ানো হবে।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সূত্র বলছে, করোনায় রাজস্ব আয়ে নাজুক পরিস্থিতির কারণে অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে আগামী বাজেটে ব্যাংক ঋণের ওপর বেশি ঝুঁকছেন অর্থমন্ত্রী। তবে নতুন কোনো কর আরোপ কিংবা কর হার বাড়ানো হচ্ছে না। বরং আসন্ন বাজেটে কর হার হ্রাস, কর ছাড়, আইনকানুন সহজসহ রাজস্ব খাতে সংস্কারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন অর্থমন্ত্রী। তবে অর্থনীতিবিদরা বলেন, আগামী বাজেটে অর্থের জোগান নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সরকারের জন্য।

বাজেট প্রণয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় আগামী বাজেট সাজানো হয়েছে। এতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে স্বাস্থ্য খাত। এছাড়া বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে প্রণোদনাসহ নানা ধরনের পদক্ষেপ থাকছে। বাড়ছে সামাজিক সুরক্ষার আওতা। উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

টাকা আসবে যেখান থেকে : এবার অর্থবছরের (২০২০-২১) বাজেটের সম্ভাব্য আকার ধরা হয়েছে ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। প্রস্তাবিত বাজেটের অর্থ জোগানের ক্ষেত্রে রাজস্ব বাবদ আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮২ হাজার ১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) আয় করতে হবে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। বাজেটের ব্যয় মেটাতে করবহির্ভূত রাজস্ব আহরণ করতে হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা এবং কর ছাড়া অন্যখাত থেকে আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৩ কোটি টাকা। এর বাইরে বৈদেশিক অনুদান পাওয়ার পরিমাণ ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৩ কোটি টাকা। এছাড়া এর বাইরেও ২০২০-২১ সরকার অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে ১ লাখ ৯ হাজার ৯৮০ কোটি টাকা। যার মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ৮৪ হাজার ৯৮০ কোটি, সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি ও অন্যান্য খাত থেকে ঋণ নেবে আরও ৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী বছর বৈদেশিক ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে ৭৬ হাজার ৪ কোটি টাকা।

প্রস্তাবিত বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি। চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) জন্য পাঁচ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করা হলেও পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বাজেটে এর আকার দাঁড়ায় ৫ লাখ ১ হাজার ৫৭৭ কোটি টাকা।

বাজেট ঘাটতি : নতুন বাজেটের ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে জিডিপির ৬ শতাংশের কাছাকাছি, যা টাকার অঙ্কে এক লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। আর মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৪ শতাংশ। আগামী বাজেটে জিডিপির প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৮ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের (২০১৯-২০) মূল বাজেটের আকার পাঁচ লাখ ২৩ হাজার কোটি টাকা। এতে ঘাটতি ধরা হয় এক লাখ ৪৫ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ৫ শতাংশ। বর্তমানে মূল বাজেট সংশোধন করে পাঁচ লাখ পাঁচ হাজার কোটি টাকা করা হয়েছে।

নীতিনির্ধারক সূত্রে জানা গেছে, সম্পদের সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও আরও বড় বাজেট দিচ্ছে সরকার। যুক্তি হলো- করোনা দুর্যোগে স্বাস্থ্য, খাদ্য, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিসহ নানা খাতে সরকারি ব্যয় বেড়ে গেছে। বিনামূল্যে চাল বিতরণ, ১০ টাকা দামে গরিব মানুষকে চাল সরবরাহ করা, করোনাকালীন কর্মহীন মানুষকে নগদ টাকা দেওয়া, অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণাসহ নানা আর্থিক সুবিধা দেওয়ায় ভর্তুকির চাপ বেড়ে গেছে। এজন্য বাড়তি অর্থ জোগান দিতে হবে। এছাড়া বেশি ব্যয় করলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা চাঙ্গা হবে। এতে করে ঝিমিয়ে পড়া অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। এসব বিবেচনা করে করোনাকালীন সংকট মোকাবিলায় বিশাল অঙ্কের বাজেট তৈরি করছে সরকার।

সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত নতুন বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে আগের চেয়ে প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। এছাড়া কৃষি উৎপাদন বাড়াতে ভর্তুকিতে বরাদ্দ থাকছে ৯ হাজার কোটি টাকা। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ খাতে বরাদ্দ বাড়ছে অতিরিক্ত তিন হাজার কোটি টাকা, ভর্তুকি দেড় হাজার কোটি টাকা। একই সঙ্গে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় সামগ্রিকভাবে বর্তমান ৭৪ হাজার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব থাকছে আসন্ন বাজেটে।

এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, নতুন কোনো কর বা কর হার বাড়ছে না। তবে নন-লিস্টেড কোম্পানির করপোরেট কর কমানো হচ্ছে বর্তমানের চেয়ে আড়াই শতাংশ। উচ্চবিত্তদের কাছ থেকে আদায় বাড়াতে সারচার্জ বাড়ানো হতে পারে। ১০ শতাংশ হারে কর দিয়ে বিনা শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। আমদানি ক্ষেত্রে বিলাস ও অপ্রয়োজনীয় পণ্যে আমদানি নিরুৎসাহিত করতে কিছু পণ্যে শুল্ক বৃদ্ধি করা হচ্ছে। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সিগারেট ও টোব্যাকোতে শুল্ক বৃদ্ধির প্রস্তাব থাকছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা কেন্দ্রের (বিআইডিএস) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ জানান, মানুষের জীবন-জীবিকা যেন টিকে থাকে সেদিকে নজর রেখে বাজেট দিতে হবে। মানুষের কাছে যেন খাদ্য ও অর্থ সহায়তা পৌঁছে, তা দেখতে হবে। মানুষ যেন টিকে থাকতে পারে সে ধরনের বাজেট দিতে হবে।

ড. নাজনীন বলেন, এটি স্বাভাবিক কোনো বাজেট নয়, এটি টিকে থাকার বাজেট। উন্নয়নের যে জাহাজটি এগিয়ে যাচ্ছিল, সেটা এখন হাল ধরে রাখার বাজেট।

ব্যয় বাবদ বরাদ্দ : আগামী বাজেট পরিচালনাসহ অন্যান্য ব্যয় বাবদ খরচ ধরা হচ্ছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সরবরাহ ও সেবা বাবদ ব্যয় বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ রাখা হচ্ছে ৬৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও অনুদান বাবদ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ থাকছে ২ লাখ পাঁচ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা।

জানা গেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে সর্বাধিক বরাদ্দ রাখা হবে। এ খাতে ৩২ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকবে। এছাড়া নতুন বাজেটে কৃষি, জনপ্রশাসন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কর্মসংস্থান খাতে বেশি বরাদ্দ রাখা হবে।

এবারের বাজেটে কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, জীবন-জীবিকা নির্বাহ করে মানুষ যেন অন্তত টিকে থাকতে পারে সে বিষয়টি মাথায় রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বাজেট তৈরি করা হয়েছে। বাজেটে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে আগামী ২০ বছরের পরিকল্পনা থাকছে। তাই অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় স্বাস্থ্যবিষয়ক শিক্ষায় গবেষণা বাড়ানোর জন্য বরাদ্দ রেখেছেন বলে জানান তিনি।

পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন