আমাদের গ্যাস চলে যাবে মিয়ানমারে!

  


পিএনএস ডেস্ক: গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনো প্রয়োজন নেই বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, গ্যাস খাতে সুশাসন এলে আর চুরি বন্ধ করা হলে ঘাটতি এমনিতেই কমে যাবে। পাশাপাশি উচ্চ মূল্যের জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা কমে যাবে অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো হলে। তারা জানিয়েছেন, বর্তমানে গ্যাসের মূল্য বাড়ানো হলে শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে সব ধরনের পণ্যের দাম। এতে শুধু এই মূল্য বৃদ্ধি সাধারণ মানুষকেই ভোগাবে না, দেশের শিল্প উৎপাদনেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

পাওয়ার সেলের সাবেক মহাপরিচালক ও জ্বালানি বিশ্লেষক বিডি রহমত উল্লাহ গত সোমবার জানিয়েছেন, গ্যাস খাতে লোকসান কমাতে হলে প্রথমে চুরি ঠেকাতে হবে। পাশাপাশি সাগর ও স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধানের ওপর জোর দিতে হবে। তিনি বলেন, ভারত ও মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তি হলেও সমুদ্রে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য অনুসন্ধান চালানো হয়নি। যদিও সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর মিয়ানমার বেশ দ্রুততার সাথেই ১১ নম্বর গ্যাস ব্লকে গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করেছে। ২০১৭ সাল থেকে মিয়ানমার বাণিজ্যিকভাবে চীন ও ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রি করছে। অথচ এর পাশেই আমাদের ১২ নম্বর ব্লক। এ ব্লক থেকে গ্যাস উত্তোলন তো দূরের কথা কী পরিমাণ গ্যাস মজুদ রয়েছে তাও আমরা নির্ধারণ করতে পারিনি। প্রথমে সাগর বক্ষের এ ব্লক থেকে গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কারের জন্য মার্কিন কোম্পানি শেভরনের সাথে চুক্তি করা হয়েছিল। কিন্তু চুক্তির কিছু দিনের পর তা বাতিল করা হয়েছে। আবার কোরিয়ান এক কোম্পানির সাথে চুক্তি করা হয়েছে। শেভরনের সাথে চুক্তি বাতিল না করলে এতদিন গ্যাসপ্রাপ্তির সময় এসে যেত বলে তিনি মনে করেন।

বিডি রহমতুল্লাহ বলেন, পাশাপাশি দুটি গ্যাস ব্লকের একটি থেকে উত্তোলন শুরু হলে আর অপরটি থেকে উত্তোলন না করায় অভিন্ন কাঠামো হলে এক সময়ে আমাদের ব্লকের গ্যাস চলে যাবে মিয়ানমারে।

জ্বালানি বিশ্লেষক বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, আমাদের সমুদ্রবক্ষে যথেষ্ট পরিমাণ গ্যাস আছে। যদি সেগুলো অনুসন্ধান ও উত্তোলন করা হতো, তাহলে এখন যে গ্যাস সঙ্কট রয়েছে তা হতো না। উচ্চমূল্যের জ্বালানি আমদানি করার প্রয়োজন হতো না। তিনি বলেন, দেশে গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বর্তমানে ১২ টিসিএফ গ্যাস মজুদ রয়েছে। প্রতি বছর এক টিসিএফ গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। সে হিসেবে ১২ বছরের মধ্যেই গ্যাসের মজুদ শেষ হয়ে যাবে। নতুন গ্যাস ক্ষেত্রে আবিষ্কার না হলে দেশের চাহিদা সম্পূর্ণ উচ্চমূল্যের জ্বালানিনির্ভর হয়ে পড়বে। গ্যাসের দাম বহুগুণ বেড়ে যাবে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যয় বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে সব ধরনের পণ্যের উৎপাদন মূল্য। শিল্পে অচলাবস্থা দেখা দেবে।

এ থেকে উত্তরণের উপায় কী এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিডি রহমত উল্লাহ বলেন, এ থেকে উত্তোরণের একটাই পথ আর তা হলো অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে হবে। এজন্য ব্যাপক ভিত্তিতে নতুন গ্যাস ক্ষেত্রের অনুসন্ধান চালাতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সাগর বক্ষে গ্যাসপ্রাপ্তির যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। বঙ্গোপসাগরে এখন বাংলাদেশের ২৬টি ব্লক রয়েছে। এর মধ্যে ১৩টি অগভীর ও ১৩টি গভীর সমুদ্রে রয়েছে। বিদেশী কোম্পানিগুলো যাতে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমায় গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য আগ্রহী হয়, সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে যথাযথ উদ্যোগ নিতে হবে। বিশেষ করে এজন্য একটি তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে হবে। মোট কথা গ্যাস উত্তোলন নিয়ে ব্যাপক ভিত্তিতে উদ্যোগ নেয়া হলে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে গ্যাসের মজুত ও উৎপাদন বেড়ে যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিরোধিতা করে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. এম শামসুল আলম গত সোমবার বলেন, বর্তমান সময়ে গ্যাসের দাম বাড়ানোর কোনোই যুক্তি নেই। কারণ, জ্বালানি খাতকে অনিয়ম ও দুর্নীতিমুক্ত করা গেলে গ্যাসের দাম বাড়াতে হবে না। গ্যাসের যে অনিয়ম দুর্নীতি হয়েছে তা নিয়ন্ত্রণ করলে বছরে সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা বাঁচানো যাবে। কুষ্টিয়া খুলনা গ্যাস যাবে না জেনেও সেখানে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে। তিনি বলেন, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি করা হলে শুধু সাধারণ মানুষকেই তা ভোগাবে না, একই সাথে দেশের শিল্প উৎপাদনেও এর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। পণ্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যাবে। ভোগান্তিতে পড়তে হবে সাধারণ মানুষকে।

জানা গেছে, গ্যাসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু মজুদ বাড়ছে না। নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার না হওয়ায় গ্যাসের বিদ্যমান মজুদও ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে চাহিদা মেটাতে উচ্চ মূল্যের জ্বালানি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করতে হচ্ছে। এতে বাড়ছে গ্যাসের গড় দাম। বেশি দামে আমদানি করে কম মূল্যে বিক্রি করায় ভর্তুকি বেড়ে যাচ্ছে। এ ভর্তুকি কমাতে হলে গ্যাসের মূল্য বিদ্যমান দামের চেয়ে কয়েক গুণ বাড়াতে হবে। সামনে নতুন নতুন গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে পুরোপুরি উচ্চ মূল্যের জ্বালানিনির্ভর হয়ে পড়বে দেশ। বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি দামও বেড়ে যাবে। বাড়বে পণ্যের উৎপাদন ব্যয়। ফলে দেশের শিল্প খাত অচলাবস্থায় পড়ে যাবে। এমনি পরিস্থিতিতে গ্যাস নিয়ে এ বহুমুখী সঙ্কট মেটাতে অভ্যন্তরীণ গ্যাসের অনুন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন বিশেজ্ঞরা।

প্রসঙ্গত, গ্যাসের দাম বাড়ানোর জন্য গত মার্চ মাসে উৎপাদন ও বিতরণ কোম্পানিগুলোর দাম বাড়ানোর প্রস্তাবের ওপর গণশুনানির আয়োজন করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটারি কমিশন (বিইআরসি)। কিন্তু ব্যবসায়ী ও ভোক্তা সাধারণের তীব্র বিরোধিতা ও প্রতিবাদ এবং রমজানের কারণে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর সিদ্ধান্ত দেয়নি বিইআরসি।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলেন, গ্যাস সঞ্চালন ও বিতরণ কোম্পানিগুলো লাভে থাকলে বিইআরসি আইন অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিতে পারে না। দেশে গ্যাস সঞ্চালন কোম্পানি একটি। আর বিতরণ কোম্পানি তিতাস, বাখরাবাদ, কর্ণফুলীসহ ছয়টি। এর মধ্যে একটি সুন্দরবন ছাড়া বাকি পাঁচটি কোম্পানি লাভে রয়েছে। একমাত্র সঞ্চালন কোম্পানি জিটিসিএলও লাভে রয়েছে। এ মুহূর্তে গ্যাসের মূল্য বাড়ানোর কোনো যৌক্তিকতা নেই।

গত ৯ জুন বিদ্যুৎ ও জ্বলানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, গ্যাসের দাম সমন্বয় না করলে চলতি বছরে ৫ থেকে ৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। গ্যাসে আমরা ১৪ হাজার কোটি টাকার মতো এর মধ্যে ব্যয় করে ফেলেছি। এখন সামনে আরো ১৪ হাজার কোটি টাকা লাগবে। এই টাকাটা আসবে কোথা থেকে। যদি গ্যাসের দাম সমন্বয় না করা হয় তাহলে সমস্যা দেখা দেবে। সূত্র: নয়া দিগন্ত

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech