খনির কয়লা কি অক্ষয়

  


পিএনএস ডেস্ক: বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির (বিসিএমসিএল) কয়লা কি অক্ষয়? গ্যাস, বিদ্যুৎ. পানি, জ্বালানিসহ অন্যান্য সেবা খাতের সিস্টেম লসের হিসাব কষা হলেও গত ১৭ বছরে কয়লার সিস্টেম লসের কোনো হিসাব করা হয়নি। কাগজে মজুদের একটি হিসাব বজায় রেখে কোল ইয়ার্ড থেকে কয়লা বিক্রি করা হয়েছে বছরের পর বছর।

সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেছেন, কয়লার সিস্টেম লসের কোনো হিসাব থাকতে পারে না। এদিকে নিরপেক্ষ একজন খনি প্রকৌশলী বলেছেন, কয়লার সিস্টেম লস ছিল- আছে, থাকবে। অপরদিকে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, তারা ডকুমেন্টের বাইরে গিয়ে তদন্ত করবেন না।

সূত্র জানায়, কয়লার ঘাটতি নিয়ে যেহেতু একাধিক তদন্ত হচ্ছে, তাই ২০০৫ সাল থেকে ১৪ বছরে কয়লার কতটুকু সিস্টেম লস হয়েছে তা তদন্ত করেই নির্ধারণ করতে হবে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খনির কয়লা উত্তোলন, মজুদ ও বাজারজাতের ক্ষেত্রে সিস্টেম লসের গ্রহণযোগ্য একটা হিসাব রয়েছে।

বিদ্যুৎ, খনিজ সম্পদ ও জালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, পৃথিবীর কোনো দেশের কয়লা খনিতে সিস্টেম লসের কোনো বিধান নেই। বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানিরও (বিসিএমসিএল) সিস্টেম লসের বিষয় নেই। এ ক্ষেত্রে কোনো আদেশও জারি করার প্রয়োজন নেই। প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, বিসিএমসিএলের রুলস অ্যান্ড রেগুলেশন অনুযায়ী খনির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা বা আইনের প্রয়োজন নেই।

গত জুলাই মাসের শেষদিকে খনির ইয়ার্ড থেকে কয়লা পুরোপুরি খালি হয়। এর পরই বেরিয়ে আসে ঘাটতির হিসাব। গত ১৪ বছরে ১ দশমিক ৪২ শতাংশ ঘটিতির যে হিসাব পাওয়া গেছে, তা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের খনির ঘাটতির তুলনায় খুবই কম। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খনির একজন সাবেক এমডি বলেন, ওই ঘাটতিই মূলত সিস্টেম লস।

এদিকে ২৩০ কোটি টাকা মূল্যের ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের তদন্ত টিমেও একজন কোল বিশেষজ্ঞ থাকা প্রয়োজন বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, কয়লার সিস্টেম লস হোক বা না হোক- কমিশন ডকুমেন্টের বাইরে কোনো কাজ করবে না। সিস্টেম লসের কোনো আদেশ থাকলে সেই হিসাব অনুযায়ী তদন্ত করা হবে। আদেশ না থাকলে সিস্টেম লসের হিসাবে আনা কষ্টসাধ্য হবে। তবে দুদক গোড়া থেকে সবই খতিয়ে দেখবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও খনি প্রকৌশলী চৌধুরী কামরুজ্জামান বলেন, কয়লার সিস্টেম লস ছিল, আছে, থাকবে। দেশের প্রতিটি সেবা খাতে সিস্টেম লস আছে। পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, টেলিফোনসহ সব খাতে গ্রহণযোগ্য স্বীকৃত সিস্টেম লস আছে। এ ছাড়াও যে কোনো ক্ষেত্রে সিস্টেম লস আছে- এটা ধরে নিতে হবে, মেনে নিতে হবে। প্রতিবেশী দেশ ভারতের কয়লা খনিতে কম-বেশি ৫ শতাংশ সিস্টেম লস ধরা হয়। সব দেশের কয়লা খনিতে সিস্টেম লস আছে। বাংলাদেশের খনিতেও সিস্টেম লস হয়েছে। বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্ধারা তদন্ত করে সেই সিস্টেম লস বের করা যেতে পারে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০১ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কাজ শুরু হলেও উৎপাদন শুরু হয় ২০০৫ সাল থেকে। ২০০১ সাল থেকে গত ১৭ বছরে কয়লা খনি পরিচালনার কোনো নীতিমালা বা আইন তৈরি করা হয়নি। কয়লার সিস্টেম লসের কোনো আদেশও জারি করা হয়নি। বিপদে পড়লেই পরামর্শ নেওয়া হয় খনিতে কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সূত্র জানায়, কয়লা ঘাটতির জন্য জন্য শুধু খনির কর্মকর্তাদের দোষারোপ করলে হবে না। এর একটি পরিচালনা পর্ষদ আছে। পর্ষদের চেয়ারম্যান আছেন। মন্ত্রণালয় আছে। কয়লার সব কাজে তাদের সংশ্নিষ্টতা আছে। খনির সিস্টেম লসের বিষয়টি এক পর্যায়ে খনির পর্ষদ সভায় উত্থাপন করা হয়েছিল। এই হিসাব নির্ণয়ের জন্য কমিটিও হয়েছিল। পরে কমিটি কাজটি সম্পন্ন করেনি। ২০১৫ সালে ২৭ হাজার টন সিস্টেম লসের কথা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল। কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেননি।

সিস্টেম লসের বৈধতা না থাকলে এই লসের দায় কার ঘাড়ে চাপবে- সে প্রশ্ন এখন সামনে চলে এসেছে। বাংলাদেশের কোল ইয়ার্ড খোলা আকাশের নিচে। বৃষ্টি পড়ছে, রোদ লাগছে; ঝড় হচ্ছে। কয়লার ক্ষতি হবেই। ওজন কমবেই।

যেভাবে সিস্টেম লস ;
কয়লার রাসায়নিক গুণ : একটি কয়লা খণ্ডের ভেতরে সাধারণত ৫-১৫ শতাংশ পানি থাকে। বড়পুকুরিয়ার কয়লায় ৫-৮ শতাংশ পানি থাকে। মাসের পর মাস ইয়ার্ডে থাকা কয়লা থেকে জলীয় বাষ্প বেরিয়ে যায়। এতে কয়লার ওজন কমে যায়।

কোল ডাস্ট : কয়লাকে দাহ্যতা থেকে রক্ষার জন্য নিয়মিত পানি ছিটাতে হয়। ওই সময় কয়লা চূর্ণগুলো ধুয়ে ড্রেন দিয়ে বের হয়ে যায়। পরে বৃষ্টির পানিতে কয়লার উপরিভাগের স্তর ধুয়ে যায়। এ কারণেও কয়লার ওজন কমে যায়।

অস্বাভাবিক মজুদ : কয়লা খনি সূত্র জানায়, বড়পুকুরিয়া খনি সংলগ্ন ১৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত ইয়ার্ডে কয়লা মজুদ রাখা হয়। ২০০৫ সালে উৎপাদন শুরু থেকে টানা ১৪ বছর মজুদ ছিল। অনেক সময় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি উচ্চতায় মজুদ ছিল। এতে অক্সিডেশন সংঘটিত হয়ে পুড়ে কয়লার ওজন কমেছে। ওজন কমার হিসাব কখনও নিরূপণ করা হয়নি।

মাপার সময় ওজনের তারতম্য : খনির কয়লা মজুদ করার সময় একটি বেল্ট ওয়েইং স্কেল দিয়ে মাপা হয়। পরে আরও একটি বেল্ট ওয়েইং স্কেল দিয়ে মেপে পিডিবির কাছে বিক্রি করা হয়। তিনটি ট্রাক ওয়েইং স্কেল দিয়ে মেপে বিক্রি করা হয় স্থানীয় ক্রেতাদের কাছে। একাধিক স্কেলে মাপার সময় যান্ত্রিক কারণে কম-বেশি হওয়ার কারণেও কয়লার হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটতে পারে।

গ্রীষ্ফ্মকালে বাতাসে উড়ে যায় : খোলা কোল ইয়ার্ডে লাখ লাখ কয়লা মজুদের কারণে গ্রীষ্ফ্মকালে কয়লার ডাস্ট পার্টিকেল বাতাসে উড়ে যায়। গত ১৪ বছরে এ ঘটনায় কয়লা কমেছে।

অন্যান্য দেশে কয়লার সিস্টেম লস
ভারত : ভারতের কয়লা খনির সিস্টেম লস কম-বেশি পাঁচ শতাংশ। এর মধ্যে পাঁচ শতাংশের কম লস খনি কর্তৃপক্ষ অনুমোদন করবে। পাঁচ শতাংশের বেশি হলে সরকারের সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে।

স্পেন : স্পেনে উন্মুক্ত ইয়ার্ডে মজুদ কয়লার ১২ শতাংশ সিস্টেম লসের বৈধতা দেওয়া হয়েছে।

একইভাবে চীন, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপের দেশগুলোতে খনির উত্তোলিত কয়লা মজুদ, সরবরাহের ক্ষেত্রে সিস্টেম লসের সুনির্দিষ্ট হিসাব রয়েছে।

বড়পুকুরিয়া খনির সিস্টেম লসের হিসাব
সূত্র জানায়, ২০০৫ সাল থেকে কয়লার মোট উৎপাদন ১ কোটি ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫ দশমিক ৩২ টন। এই সময়ে বিক্রি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহার হয়েছে ১ কোটি ২১ হাজার ৫৫৯ দশমিক ৭৮ টন। এই হিসাব অনুযায়ী, ২০০৫ সাল থেকে গত প্রায় ১৪ বছরে সিস্টেম লস হয়েছে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৫২৫ দশমিক ৫৪ টন। এই লস ১৪ বছরের মোট উৎপাদানের ১ দশমিক ৪২ শতাংশ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খনির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ মূলত বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) জন্য নিজ দায়িত্বে কয়লা মজুদ রাখে। পৃথিবীর কোনো দেশে খনি কর্তৃপক্ষ তার গ্রাহকের জন্য কয়লা মজুদ রাখে না। বিভিন্ন দেশে কয়লা উত্তোলন শেষে স্বল্প সময়ের মধ্যে সংশ্নিষ্ট গ্রাহকের কাছে সরবরাহ করা হয়। বড়পুকুরিয়া খনিতে ১৪ বছর ধরে পিডিবির জন্য কয়লা মজুদ রাখা হয়েছে খনি পরিচালনা পর্ষদের নির্দেশ অনুযায়ী। মজুদ পর্যায়ের এই ক্ষতির দায় কে নেবে- প্রশ্ন তুলেছেন ওই কর্মকর্তা।

সিস্টেম লসের হিসাব নেই
খনি পরিচালনার নীতিমালা না থাকার কারণে এ পর্যন্ত এই শিল্পে সিস্টেম লসেরও কোন আদেশ জারি করা হয়নি। খনি সংশ্নিষ্ট একটি সূত্র জানায়, নীতিমালা না থাকার পরও খনির পর্ষদ বা মন্ত্রণালয় থেকে সিস্টেম লসের নির্দিষ্ট একটি হিসাব চুড়ান্ত করতে পারত। দীর্ঘ দিনেও সেই কাজটি করা হয়নি।

অন্যান্য খাতে সিস্টেম লস
পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের সহযোগী কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা, যমুনা থেকে জ্বালানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে প্রতি একশ' লিটারে ১ দশমিক ৭ শতাংশ সিস্টেম লস ধরা হয়। কম-বেশি ১৫ শতাংশ পানির অপচয়কে সিস্টেম লস হিসেবে ধরে নেয় ওয়াসা। পুরনো লাইন, লিকেজসহ নানা সমস্যার কারনে ওয়াসার সিস্টেম লসের রেশিও আরও বেশি। গত অর্থ বছরে বিদ্যুৎ বিতরনের ক্ষেত্রে সিস্টেম লস হয়েছে ৯.৭৭ শতাংশ। একই বছরে তিতাস গ্যাস বিতরনে সিস্টেম লস হয়েছে ৪-৫ শতাংশ।

গুদামে খাদ্য মজুদ ও খাদ্য চলাচলের ক্ষেত্রে সরকারিভাবে সিস্টেম লসের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে চাল, গম গুদামে ছয় মাস মজুদ রাখার ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ, একই সময় পর্যন্ত ধান মজুদের ক্ষেত্রে দশমিক ৭৫ শতাংশ ঘটতিকে স্বাভাবিক বলা হয়েছে। খাদ্যপণ্য চলাচলের ক্ষেত্রে শূন্য দশমিক ১২৫ শতাংশ ঘাটতিকেও স্বাভাবিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

সরকারের বিভিন্ন খাতে অনুমোদিত সিস্টেম লসের গ্রহণযোগ্য হিসাব থাকলেও খনির কয়লা উত্তোলন, মজুদ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে সিস্টেম লসের কোনো হিসাব নেই।

১৭ বছরেও খনির নীতিমালা হয়নি
খনির প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি আইন তৈরি করা হলেও গত ১৭ বছরেও খনন, উৎপাদন, মজুদ, বিক্রি ও অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কোনো নীতিমালা তৈরি করা হয়নি। ভারত, চীনসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের খনির সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনায় সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কার্যক্রম চলছে খনিতে কর্মরত চীন ও যুক্তরাজ্যের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী। সূত্র: সমকাল

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech