এবার দুর্নীতিগ্রস্ত ফারমার্স ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে উদ্যোগ

  


পিএনএস ডেস্ক: রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পর এবার দুর্নীতিগ্রস্ত বেসরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। যে বেসরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণ করা হবে সেই আলোচিত ব্যাংকের নাম হচ্ছে ‘ফারমার্স ব্যাংক লিমিটেড’। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরের প্রতিষ্ঠিত এই ব্যাংকটি ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে বর্তমানে দেউলিয়া হতে বসেছে। তাই মরণাপন্ন ব্যাংকটিকে বাঁচানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে সরকার।

মূলধন ঘাটতি পূরণের জন্য ফারমার্স ব্যাংকের প্লেসমেন্ট শেয়ার ছাড়া হবে। প্রাথমিকভাবে এই শেয়ারের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে এক হাজার ১০০ কোটি টাকা। কিন্তু ডুবন্ত এই ব্যাংকের শেয়ার তো আর বেসরকারি খাতের কোনো উদ্যোক্তা কিনবে না; তাই সরকারের চার ব্যাংক ও এক প্রতিষ্ঠানকে এই ব্যাংকের শেয়ার কেনার জন্য চাপ দেয়া হয়েছে। ফলে অনেকটা বাধ্য হয়ে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই শেয়ার কিনতে রাজি হয়েছে। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে অর্থমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেছে। তিনি বলেছেন, এ ব্যাংকের জন্য কিছুটা তো করতে হবে। কারণ কোনো ব্যাংককে সরকার দেউলিয়া হতে দিতে পারে না। কারণ তা হবে যেকোনো দেশের জন্য ভয়ঙ্কর।

এই যখন অবস্থা তখন ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কেনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য আগামী মঙ্গলবার একটি বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে। সে দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের সভাপতিত্বে ওই বৈঠকে ফারমার্স ব্যাংকের শেয়ার কেনার বিষয়টি অনুমোদন দেয়া হতে পারে বলে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও আইসিবি সূত্রে জানা গেছে।

এত দিন ধরে অনিয়মে জর্জরিত বেসিক, সোনালী, জনতা ও রূপালী ব্যাংকের মতো সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি পূরণ করেছে সরকার। প্রতি বছর বাজেট থেকে এ ব্যাংকগুলোকে হাজার কোটি টাকা দেয়াও হয়েছে। গত আট বছরে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে দেয়া হয়েছে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা। এবার এই প্রথমবারের মতো দুুর্নীতির কারণে দেউলিয়া হওয়ার মুখে ‘ফারমার্স ব্যাংক’কে তহবিল জোগান দিতে যাচ্ছে সরকার। এ কাজটি করানো হচ্ছে সরকারি আর্থিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশের (আইসিবি) মাধ্যমে। এ প্রতিষ্ঠানের সাথে যোগ দিচ্ছে সরকারের আরো চারটি ব্যাংক।

এ ব্যাংকগুলো হচ্ছে সোনালী, জনতা, অগ্রণী ও রূপালী ব্যাংক। এ চার ব্যাংক ও আইসিবি মিলে ফারমার্স ব্যাংকের মোট এক হাজার ১০০ কোটি টাকার শেয়ার কিনতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে শেয়ার কেনার বিষয়ে এ পাঁচ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তারা দুই দফা বৈঠকও করেছেন।

ফারমার্স ব্যাংককে উদ্ধারের জন্য সরকার কোনো ‘বেইল আউট’ প্যাকেজ নিচ্ছে কিনা গত বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, কিছু একটা করতেই হবে। তবে যেহেতু এটি একটি বেসরকারি ব্যাংক, তাই এই পদ্ধতিটিও হবে সেভাবে। এর আগে অর্থমন্ত্রী রূপালী ব্যাংকের ব্যবসায়িক সম্মেলনে বলেছেন, সরকার কোনো ব্যাংককে ধসে যেতে দিতে পারে না। কারণ ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে যাওয়া যেকোনো দেশের জন্য একটি ভয়ঙ্কর ঘটনা।

জানা গেছে, প্রথম দিকে আইসিবির পক্ষ থেকে শেয়ার কেনার প্রস্তাবে সাড়া দেয়া হয়নি। কিন্তু উপরের চাপে তারা বাধ্য হয়ে শেয়ার কিনতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিবির এক কর্মকর্তা নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেছেন, ওপরে যাই বলা হোক না কেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে ফারমার্স ব্যাংক দেউলিয়াই হয়ে গেছে। আমানতকারীদের টাকা তো তারা ফেরত দিতেই পারছে না। উপরন্তু ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ঠিকমতো মাসিক বেতন পাচ্ছে না বলে জানা গেছে। এ অবস্থায় এ ব্যাংকের শেয়ার কেনা হচ্ছে টাকা পানিতে ঢালার নামান্তর। কিন্তু কী আর করা, উপরের নির্দেশ, আমাদের তো অনিচ্ছা সত্ত্বেও শেয়ার কিনতে হবে। কারণ আমরাতো সরকারি প্রতিষ্ঠান।

জানা গেছে, দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে চরম মূলধন ঘাটতিতে থাকা ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালকেরা এর আগেও এক দফা বৈঠক করে পাবলিক প্লেসমেন্টের মাধ্যমে বাজার থেকে ১১শ’ কোটি টাকা উত্তোলনের প্রচেষ্টা নিয়েছিলেন। কিন্তু বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়ে যায়। এরপর বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকেও রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেয়া হয়Ñএ ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি পূরণে তারা যেন উদ্যোগ নেয়। শুধু তা-ই নয়, ফারমার্স ব্যাংককে ৫০০ কোটি টাকার বন্ড ছাড়ারও অনুমতি দেয়া হয়েছে।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর এ ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা। ২০১৩ সালের ৩ জুন ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু করা ব্যাংকটির বর্তমান অবস্থা বেশ নাজুক। অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গেছে যে, ব্যাংকটি তাদের আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে পারছে না। সরকারের জমা রাখা জলবায়ু তহবিলসহ আরো বেশ কয়েকটি বিশাল অঙ্কের টাকা এ ব্যাংক ফেরত দিতে অপারগতা প্রকাশ করেছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ তাই বলতে বাধ্য হয়েছে, ‘ব্যাংকটি সমগ্র ব্যাংকিং খাতে সিস্টেমেটিক রিস্ক (পদ্ধতিগত ঝুঁকি) সৃষ্টি করছে, যা আমানতকারীদের আস্থা নষ্ট করতে পারে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে ফারমার্স ব্যাংকে ১৩টি অনিয়মের তালিকা উঠেছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি ছিল বড় ধরনের অনিয়ম। অনিয়মের মধ্যে রয়েছে- ব্যাংকের নিজস্ব ঋণ নীতিমালা অনুসরণ না করে গ্রাহকদের ঋণ সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। ব্যাংক কর্তৃক ঋণের অর্থের সদ্ব্যবহার নিশ্চিত না করে গ্রাহকদের উদ্দেশ্যবহির্ভূত খাতে অর্থ স্থানান্তরে পরোক্ষভাবে সহায়তা করা হয়েছে। অস্তিত্ববিহীন/সাইনবোর্ডসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলেও ঋণ দেয়া হয়েছে। ঋণ নিয়মচার লঙ্ঘন করে ব্যাংকের পরিচালক এবং অন্য ব্যাংকের পরিচালদেরও ঋণ দেয়া হয়েছে। অপর্যাপ্ত ও ত্রুটিযুক্ত জামানতের বিপরীতে ঋণ মঞ্জুর করা হয়েছে।

গ্রাহক ঋণ খেলাপি, তবুও তাকে ঋণ দেয়ার ঘটনা ঘটেছে ফারমার্স ব্যাংকে। একক ঋণগ্রহীতার সর্বোচ্চ ঋণসীমার অতিরিক্ত ঋণ সুবিধাও দেয়া হয়েছে। ব্যাংকের নিজেদের অবস্থা ভালো নয়, তা সত্ত্বেও অন্য ব্যাংকের ঋণ অধিগ্রহণ করা হয়েছে। নির্বাহী কমিটি, ব্যাংক ব্যবস্থাপনা এবং শাখা প্রধান কর্তৃক এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে গ্রাহকদের ঋণ দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশ ছিল ফারমার্স ব্যাংক কাউকে বড় অঙ্কের ঋণ দিতে পারবে না। কিন্তু সেই নির্দেশনা না মেনে দেয়া হয়েছে বড় অঙ্কের ঋণ। প্রয়োজনীয় ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদের অতিরিক্ত মেয়াদও অনুমোদন করা হয়েছে ঋণগ্রহীতাদের। লোকবল নিয়োগেও অনিয়ম করেছে ফারমার্স ব্যাংক।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে এ ব্যাংক সম্পর্কে মন্তব্য করা হয়েছে, ‘ক্রমবর্ধমান অনিয়ম প্রতিরোধ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নতি এবং ঋণ নিয়মাচার শৃঙ্খলা আনয়ন অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ায় আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার লক্ষ্যে গত ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারিতে ব্যাংকটির পরিচালন পর্ষদে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে একজন পর্যবেক্ষণ নিয়োগ করা হয়। তবুও, পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি হচ্ছে না। ’ আরো বলা হয়, ‘গত এক বছর ধরে ব্যাংকটির তারল্য সঙ্কট রয়েছে এবং বর্তমানে তা তীব্র আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকের মূল তারল্য পরিমাপক সূচক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত নগত জমা (সিআরআর) সংরক্ষণে ব্যাংকটি ক্রমাগতভাবে ব্যর্থ হচ্ছে।

চলতি ২০১৭ সালের এপ্রিল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত ব্যাংকটি সিআরআর সংরক্ষণে ব্যর্থ হচ্ছে। শুধু তা-ই নয়, ব্যাংকটি দায় পরিশোধের সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে। সাধারণ আমানতকারী এবং বিভিন্ন ব্যাংক থেকে প্রচলিত হারের চেয়েও উচ্চ সুদে আমানত গ্রহণ ও অর্থ কর্জ করে বর্তমানে ব্যাংকটি টিকে আছে। ব্যাংকের ৫৪ শাখার মধ্যে ২৮টি শাখা লোকসানে রয়েছে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর, ব্যাংকের অডিট কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক চিস্তি এসব অনিয়মের সাথে জড়িত।

পিএনএস/আনোয়ার

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech