বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যখন একজন ব্যবসায়ী, তখন…

  

পিএনএস (মোহ্ম্মদ জাহাঙ্গীর আলম প্রধান) : পিঁয়াজ তোমাকে সালাম। তোমার গুণে মুগ্ধ আমরা। তুমি এখন প্লেনেও চড়। তোমার অর্জন ঈর্ষণীয়। অসামন্য, অনন্য। তোমার জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ায় কত শত মানুষ। তোমার জন্য গুলিও চলে। তোমাকে কেনার জন্য জনতার কাতারে দাঁড়ান সিলেটের মেয়র স্বয়ং। তোমার জন্য দেশবাপী ক্রেতাদের ক্ষোভ। চড়া দামের জন্য তুমি এখন আলোচনার অন্যতম উপাদান। তোমার ঝাঁজে আর উত্তেজনায় সর্বত্র সমালোচনার ঝড় বইছে। তবু বীরে বেশে দিব্বি আছেন আমাদের এককালের গুণধর ব্যবসায়ী বাণিজ্যমন্ত্রী।

আমরা হতভাগা, দুর্ভাগ্য, ফকির সমতুল্য। ফকিরের একটি গল্প আছে আমাদের গ্রামাঞ্চলে। গল্পটি এমন- ‘ফকিরের কাছে বিয়া বইয়া কত রকম চালের ভাত খাইলাম।’ বাজারে হরেক রকম পিঁয়াজের উপস্থিতি ফকিরের কাছে বিয়ে বসার গল্পটি বারবার মনে পড়ছে বোদ্ধা মহলের। ফলে তারা রাগে-ক্ষোভে নিজের মাথার চুল ছিঁড়ছেন। মনের দুঃখে নানাজনকে গালাগাল করে হালকা হচ্ছেন। কেউ কেউ ভাগ্যকে দোষ দিচ্ছেন। এসব যার ব্যর্থতায় কারণে ঘটছে তার কথায় মানুষ কখনো ভরসা করতে পারেনি।

বিদেশ থেকে বড়-ছোট মিলিয়ে কয়েক রকম পিঁয়াজ আনা হয়। একেকটির সাইজ আধা কেজিও নাকি। যার একটি বিক্রি হয় শত টাকায়। বাজারে এবং রাস্তায় পাশে ভ্যানগাড়িতে ঢাউস সাইজের ইয়া বড় পিঁয়াজ চোখে পড়ছে। এসব পিঁয়াজ দেখে অনেকে অবাক হচ্ছে। আরো অবাক হচ্ছে, এর ঊর্ধ্বমুখী দামে। কমদামে বিক্রির কথা বলে আনা এসব পিঁয়াজ যখন অধিক মূল্যে বিক্রি হচ্ছে. তখন মানুষের মধ্যে এ নিয়ে কষ্ট যারপরনাই বাড়ছে। সব খরচ মিলিয়ে ৪০ টাকা কেজির মধ্যে আমদানী করা পিঁয়াজ ২৫০ টাকায় অবাধে বিক্রি হচ্ছে রাজধানী ঢাকায়।

পিঁয়াজের তেজ প্রসঙ্গে শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত এক নেতা বলেন ‘যেমন ডাল, তেমন ভবর ভতর ।’ শব্দটার অর্থ তিনি ব্যাখ্যা করেননি। তবে এটি যে তার কষ্টের বহিঃপ্রকাশ, তা বুঝতে বাকি নেই। আবার এক শ্রমিক নেতা বলেন, ‘মন্ত্রী যখন ব্যবসায়ী, তখন এটা হওয়াই তো স্বাভাবিক।’ তার মন্তব্য- ‘এর আগে কোনো ব্যবসায়ী তো বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন না। ফলে পিঁয়াজ নিয়ে লঙ্কা কাণ্ডও ঘটেনি।’ ভদ্রলোকের কথায় অনেকেই সায় দেয়। করে নানান রকম তির্যক মন্তব্য।

মিষ্টি ছাড়া পিঁয়াজ প্রায় সব ধরনের খাবারে লাগে। খাবারে স্বাদ বৃদ্ধির জন্য পিঁয়াজ ব্যবহার হয়। পিঁয়াজ ছাড়া রান্নার কথা ভাবাই যায় না। শাকসবজি থেকে শুরু করে ভর্তায় পর্যন্ত পিঁয়াজ লাগে। লাগে বিরিয়ানিতে। গৃহস্থের পাকের ঘরসহ রাস্তার পাশের হোটেল থেকে শুরু করে পাঁচ তারকা হোটেলেও যা ব্যবহার করা হয়। এক কথায় বাঙ্গালির খাবার পিঁয়াজ ছাড়া ভাবাই যায় না। আমাদের উপাদেয় খাবারের অন্যতম অনুসঙ্গ পিঁয়াজ। তার আসন এখন অনেক উপরে সিন্ডিকেটের সুবাদে। দায়িত্বশীলদের পাহাড়সম ব্যর্থতার কারণে দামের দিক দিয়ে এটি এখন আপেল, আগুর, আনার এমনকি মুরগিকেও ছাড়িয়ে গেছে।

সূত্রমতে, আমাদের দেশে বার্ষিক পিঁয়াজ দরকার ২২ লাখ টন। গত মৌসুমে উৎপাদন হয় ২০ লাখ টন। আগের বছরের উদ্বৃত্ত ছিল ১০ লাখ টন। এর পরও একটি মহল দায়িত্বশীলদের চোখে ধুলা দিয়ে আখেরি কামাই করে বহালতবিয়তে আছে কমদামে আমদানি করে অধিক মূল্যে বিক্রি করে। এসব পিঁয়াজও ২৫০ টাকা কেজি বিক্রি হয় বাজারে! এটা খুবই দুঃখজনক। এটাকে নৈরাজ্য বললে কমই বলা হবে। মগের মুল্লুকেও এমনটা সম্ভব হতো কিনা, সে প্রশ্ন সামনে চলে এসেছে। যে প্রশ্নের আকার ও পরিধি বাড়ছেই। অথচ জাতিকে বেকুব ভেবে নানা কৌশলে সবকিছুকে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।

পিঁয়াজ সিন্ডিকেট পার পেয়ে যাওয়ায় বাজারে দ্রব্যমূল্যে আগুন লেগেছে যেন। হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম। শীতের সবজির দাম শুনলে মাথা ঘুরে যাওয়ার উপক্রম। একটি ফুলকপি ও বাঁধাকপি ৫০ টাকার নিচে মিলছে না। অথচ কদিন আগে এসব কপি ২০ টাকায় পাওয়া যেত। ৫০-৬০ টাকার নিচে মিছে না লাউ। যদিও উৎপাদনকারী কৃষক নামমাত্র মূল্য পাচ্ছেন না। কদিন আগে একাত্তর টিভিতে একজন কৃষক সাক্ষাৎকারে জানান, তারা মুলা বিক্রি করছেন ৬ টাকা কেজি! উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে তারা দিনমজুরের খরচও তুলতে পারছেন না। চাল বস্তাপ্রতি বেড়েছে ২০০ টাকা। নজরদারি ও তদারকির অভাবে মধ্যস্বত্বভোগীরা অধিক মুনাফা লুটছে।

ভবিষ্যতে আর যেন এসব লঙ্কাকাণ্ড না ঘটে, সে জন্য এখনই সতর্ক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। সিন্ডিকেটের কোমর ভেঙ্গে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যদ্রব্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে বার্ষিক প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ করে প্রয়োজনে আমদানি করে আগাম মজুদ রাখতে হবে। বাজারে টিসিবি ও খাদ্য মন্ত্রণালয় যে পণ্য বিক্রি করছে তা নিয়ে তোঘলকি কাণ্ড ঘটার এন্থার অভিযোগ রয়েছে।

রাজধানীর খিলগাঁও-রামপুরার বউবাজারে দুটি ট্রাকে কেবল সাইন বোর্ড দেখা যায়। যেখানে বিক্রিতাকে নাকি খুঁজে পাওয়া যায় না। আর কালেভদ্রে পেলেও তারা নানা অজুহাতে পণ্য বিক্রি না করে কালোবাজারে ছেড়ে দেয়। মিন্ন আয়ের ক্রেতাদের অভিযোগ, চাল না নিলে আটা দেওয়া হওয়া না। আবার আটা না নিলে চাল দেওয়া হয না। চিনি দেওয়ার কথা সাইন বোর্ডে লেখা থাকলেও তারা নাকি কখনো তা দেখেননি। আর ৫ কেজির নিচে আটা-চাল কিনতে না পেরে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন। অথচ এ পরিমাণ কজন দরিদ্র মানুষ ক্রয় করতে পারেন। নানা অজুহাত সৃষ্টি করে এসব পণ্য কালোবাজারে অধিক মূল্যে বিক্রি করা হয় বলে তারা জানান।

পিঁয়াজসহ বাজারে অধিক মূল্যে বিক্রি হওয়া পণ্যগুলো সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার জন্য দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। ক্রেতা সাধারণ আর কত অনৈতিকভাবে ফায়দা অর্জনকারী অসৎ ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি থাকবে। তাদের কথা কেউ যে ভাবে, সেটার বাস্তবতা উপলব্ধি করানোর সুযোগগুলো যে হেলায় চলে যাচ্ছে। মানুষের এসব সমস্যাকে গুরুত্বসহ নিয়ে হালের পিঁয়াজ সিন্ডিকেটসহ বাজারে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিয়ে জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধির নজির সৃষ্টি সময়ের দাবি। পিঁয়াজসহ দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির নিত্যযন্ত্রণার কালো ইতিহাস সৃষ্টির চলমান অবাক কাণ্ড ও জিম্মিদশার কবল থেকে ক্রেতা সাধারণকে মুক্তি দেওয়া জরুরি।


প্রতিবেদক : বিশেষ প্রতিনিধি- পিএনএস

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন