খাল-বিলের দেশি মাছে ভরপুর আত্রাইয়ের মাছের আড়ত

  

পিএনএস ডেস্ক: মৎস ভান্ডার খ্যাত নওগাঁর আত্রাই উপজেলার খাল-বিল ও নদীর পানি কমতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে জেলেদের জালে ধরা পড়ছে দেশি নানা প্রজাতির মাছ। ফলে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারের আড়তগুলোয় দেশি মাছে ভরপুর।

আড়তগুলোয় পাওয়া যাচ্ছে টেংরা, বাতাসি, কৈ, বোয়াল, আইড়, পাবদা, শোল, খলিশা, সরপুঁটি, গচি, শিং, রুই, কাতল, মৃগেলসহ প্রায় ৩০-৪০ প্রজাতির দেশি মাছ। আড়তগুলোয় দাম কোথাও একটু বেশি আবার কোথাও কম।

মাছের আড়তগুলোয় প্রতিদিন কাক ডাকা ভোর থেকে শুরু করে বিকেল পর্যন্ত চলছে বেঁচাকেনা। পাইকাররা এসব আড়ত থেকে কিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাচ্ছেন।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ঘুরে দেখা যায়, উপজেলার আহসানগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন বৃহৎ মাছের আড়ত, ভবানীপুর বাজার, বান্ধাইখাড়া বাজার, নওদুলি বাজার, শাহাগোলা রেলওয়ে স্টেশন বাজারে বিভিন্ন প্রাকারের দেশি মাছ বাজারে উঠছে। সময়, স্থান-কাল ভেদে এবং ক্রেতাদের চাহিদা অনুপাতে বিভিন্ন দরে এসব মাছ পাইকারি ও খুচরা বিক্রি হচ্ছে।

মৎস সংশ্লিষ্টরা জানান, একসময় এই এলাকায় দেশি প্রজাতির মাছের প্রাচুর্য ছিলো। নদী ও খাল-বিলে এসব মাছ ধরা পড়তো সহজেই। কিন্তু দিন দিন দ্রুত বর্ধনশীল মাছের বাণিজ্যিক চাষ, সংরক্ষণের অভাব ও নানা প্রাকৃতিক কারণে দেশি মাছের বহু জাতই বিলুপ্তি হয়েছিলো। কিন্ত গত কয়েক বছরে মৎস বিভাগের উদ্যোগে বিলে মাছ চাষ ও নার্সারি স্থাপন, পোনা মাছ অবমুক্ত, মা মাছ উৎপাদন বাড়াতে অভয়াশ্রম স্থাপনসহ নানামুখী পদক্ষেপ নেয়ায় বর্তমানে বিলুপ্তি হওয়া বিভিন্ন প্রজাতির মাছের দেখা মিলেছে।

ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় আগের মতো মাছের আমদানি হচ্ছে না। মাছের আমদানি বাড়াতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি। প্রতিদিন ভোর থেকে জেলেরা বিভিন্ন পরিবহনে করে বিক্রির জন্য মাছ নিয়ে আসেন আত্রাইয়ের মাছ বাজারের আড়তগুলোতে। ভোর ৬টা থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টা চলে কেনাবেচা। খালে, বিলে, নদীতে দেশি মাছ ধরা পড়ায় নওগাঁর আত্রাইয়ে জমে উঠেছে মাছের আড়তগুলো। বেশির ভাগ বিক্রীত মাছ যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে।

মাছ ব্যবসায়ী, আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এই বাজারে মাছের ব্যবসা করে আসছি। আত্রাই ও আশপাশের এলাকা থেকে এই বাজারে দেশি মাছের আমদানি হয়। এই মাছগুলো আমরা আড়তের মাধ্যমে দিনাজপুর, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, রংপুরসহ উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করি।’

জেলার আত্রাই উপজেলাসহ আশপাশের চলনবিল, হালতিবিল, বিলসুতি বিলসহ আত্রাই নদীর মাছ নিয়ে প্রান্তিক পর্যায়ের জেলেরা মাছ কেনাবেচার জন্য প্রতিদিন ভোরে এই মাছের আড়তে আসেন।

নাটোর থেকে ট্রেনে করে মাছ কিনতে আসেন এমনই একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মজিবুর রহমানের সঙ্গে কথা হয়।

তিনি বলেন, আত্রাই থেকে ভোরবেলা মাছ কিনে নাটোরের বিভিন্ন হাটে নিয়ে বিক্রি করেন তিনি।

উপজেলার পতিসরের সন্দিপ কুমার জানান, প্রতিদিন ভোরবেলা তিনি এই মাছের আড়তে আসেন। নদী ও বিলের বিভিন্ন জাতের মাছ হাট থেকে কিনে নিয়ে যান। পাবদা, পাতাসি, গুচি, ট্যাংরা, শৈল, শাটিসহ বিভিন্ন জাতের মাছ পাইকারি কিনে নিয়ে বিভিন্ন হাটে সারা দিন বিক্রি করেন।

আত্রাই মাছ বাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক মজনু আকন্দ অভিযোগ করে বলেন, ভোরবেলা হাট বসার কারণে দূর-দূরান্তের পাইকারদের রাতেই হাটে এসে থাকতে হয়। কিন্তু এখানে থাকার তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। টাকা-পয়সা নিয়ে পাইকাররা নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রাত যাপন করেন। এ জন্য হাটে পাইকারদের থাকার ব্যবস্থা করার জন্য সরকারি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

আত্রাই মাছ বাজার সমিতির সভাপতি বাবলু আকন্দ বলেন, আত্রাই মাছের আড়তের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত পরিমাণ মাছ আড়তে আনতে পারছেন না। অতিরিক্ত বর্ষায় আড়ত এলাকা পানির নিচে ডুবে যায়। প্রায় ৩৫ বছরের পুরোনো এই মাছের আড়ত থেকে দেশের উত্তরাঞ্চল, দক্ষিণাঞ্চল, ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় মাছ সরবরাহ করা হয়। ঐতিহ্যবাহী এই মাছের আড়তটিকে টিকিয়ে রাখার স্বার্থে জরুরি ভিত্তিতে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, আড়তগুলো সংস্কারের ব্যবস্থা করার দাবি জানান তিনি।

আত্রাই উপজেলার আশপাশের চলনবিল, সিংড়া বিল, হালতিবিলসহ কমপক্ষে ১০টি বিল ও নদী এলাকার প্রায় অর্ধকোটি টাকার মাছ প্রতিদিন কেনাবেচা হয় এই আড়তগুলোতে। অতিসত্বর যোগযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করা গেলে আত্রাই মাছের বাজার ফিরে পাবে তার হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্য।


পিএনএস/এএ

 

@PNSNews24.com

আপনার মন্তব্য প্রকাশ করুন
Developed by Diligent InfoTech